চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া অংশে প্রশস্তকরণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। দীর্ঘদিন ধরে সরু সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে এ অংশে যান চলাচলে ভোগান্তির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ছিল। বিশেষ করে চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকার আঁকাবাঁকা সড়কটি ছিল চালক ও যাত্রীদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। সেই ঝুঁকি কমাতে মহাসড়ক প্রশস্তকরণের পাশাপাশি জাঙ্গালিয়ায় প্রায় ৯শ মিটার সড়ক চারলেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক এবং নিরাপদ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সওজ জানা যায়, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া অংশে প্রশস্তকরণ কাজ ৩ প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরমধ্যে প্যাকেজ–১ সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার রাজঘাটা ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত ৮.৪ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ পান এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩৫ কোটি টাকা। প্যাকেজ–২ লোহাগাড়ার রাজঘাটা থেকে চুনতির মিঠার দোকান এলাকা পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ পান এম এ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩৪ কোটি টাকা। প্যাকেজ–৩ চুনতির মিঠার দোকান থেকে জাঙ্গালিয়া এলাকা পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ পান এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩০ কোটি টাকা। প্রশস্তকরণ প্রকল্পে মহাসড়কের উভয় পাশে ৬ ফুট করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে বাড়ানো হচ্ছে ১০–১২ ফুট করে। জাঙ্গালিয়ায় ৯শ মিটার মাঝখানে ডিভাইডারসহ চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। বর্তমানে প্যাকেজ–১ এর কাজ ৫০ শতাংশ, প্যাকেজ–২ এর কাজ ৪০ শতাংশ ও প্যাকেজ–৩ এর কাজ ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী গাড়ি ও ছোট যানবাহন চলাচল করে। ছুটির দিন ও বিশেষ সময়গুলোতে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়। তখন সরু সড়কের কারণে যান চলাচল ধীর হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। মহাসড়কের সাতকানিয়া–লোহাগাড়া অংশ দীর্ঘদিন ধরেই যান চলাচলের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সড়ক সরু হওয়ায় বিপরীত দিক থেকে বড় যানবাহন এলে ছোট যানবাহন ও বাইক চালকদের অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো। বিশেষ করে জাঙ্গালিয়া এলাকার বাঁকগুলোতে সামনে থেকে আসা যানবাহন অনেক সময় সহজে দেখা যায় না। ফলে সামান্য অসতর্কতাতেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতো। মহাসড়ক প্রশস্তকরণের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রশস্তকরণ কাজ চলছে। বিশেষ করে জাঙ্গালিয়া এলাকায় সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ কাজ শেষে হলে দুর্ঘটনাপ্রবণ এই অংশে যানবাহন চলাচল আরও নিরাপদ ও স্বাভাবিক হবে। তবে নির্মাণকাজ যেন দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি নির্ধারিত মান বজায় রেখে করা হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। চালকদের বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে কার্যকর নজরদারি, প্রয়োজনীয় সড়কচিহ্ন, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে লোহাগাড়া–সাতকানিয়া অংশের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে এবং চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কে যাতায়াত আরও নিরাপদ হবে বলে আশা করছেন তারা।
গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সাতকানিয়ার রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও সড়কের দুই পাশে মাটি ভরাট ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। আবার কোথাও নতুন অংশের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জাঙ্গালিয়া এলাকায় চার লেনে উন্নীত করার কাজও দৃশ্যমান। নির্মাণকাজের কারণে কোথাও কোথাও যানবাহনের গতি কিছুটা কমলেও শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততায় প্রকল্পের অগ্রগতির চিত্র ফুটে উঠেছে। এছাড়া জাঙ্গালিয়ায় কঙবাজার সওজের অধীনেও সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। ওইদিকেও প্রায় ১ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) লোহাগাড়া শাখার সাবেক সভাপতি মোজাহিদ হোসাইন সাগর জানান, চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া–সাতকানিয়া অংশ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে জাঙ্গালিয়া এলাকার সরু ও বাঁকযুক্ত সড়কে যানবাহন চলাচলের সময় চালকদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বিপরীত দিক থেকে বড় যানবাহন এলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে মহাসড়ক প্রশস্তকরণের উদ্যোগটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক প্রশস্ত হলে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল বাড়বে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমবে। তবে শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না, নির্মাণকাজ অবশ্যই নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে জাঙ্গালিয়ার মতো দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সড়কের বাঁক, সাইন–সিগন্যাল, সড়কবাতি, ডিভাইডার ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ–সহকারী প্রকৌশলী মো. শহীদুল আলম জানান, নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুযায়ী নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাজের গতি ও মান নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া অংশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, বর্তমানে বিদ্যমান ২১ ফুট প্রশস্ত সড়কটি ৩৪ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রশস্ত করার পাশাপাশি জাঙ্গালিয়া এলাকায় ৯শ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যয়ে তা সংশোধন বা পুননির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে মহাসড়কটি চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও রয়েছে।











