উদ্বোধনের পর ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি। এরই মধ্যে ‘দখল’ হয়ে গেল দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাকটি। নগরের বিমানবন্দর সড়কে সাইক্লিস্টদের জন্য তৈরি করা ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ট্র্যাকে গতকাল পার্কিং করে রাখা হয় লরি ও প্রাইভেটকার। যেন এটি সাইকেল ট্র্যাক নয়, নিরাপদ পার্কিং জোন। এর আগে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে নির্মিত এই সাইকেল ট্র্যাকটি উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এদিকে গতকাল শনিবার থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চসিকের জলাবদ্ধতা নিরসনে শিক্ষার্থী–অভিভাবক উদ্বুদ্ধকরণ কমিটির কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাইকেল ট্র্যাকে গাড়ি পার্কিং করে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, গতকাল বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক উদ্বোধন করা হলো। আজ পরিদর্শন করে দেখলাম, সেখানে একটি লরি রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি আমাদের নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয়? কেউ যদি সাইকেল ট্র্যাক দখল করে, ফুটপাত দখল করে বা নগরের কোনো স্থাপনা নষ্ট করে, তাহলে শুধু মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনকে দোষারোপ না করে নাগরিকদেরও প্রতিবাদ করতে হবে। আমরা অনেক সময় কোনো অনিয়ম দেখলে নিজের দায়িত্ব পালন না করে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করি। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও আমাদের দায়িত্ব।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, সাইকেল ট্র্যাকে ২টি প্রাইভেটকারের পাশাপাশি সরকারি একটি সংস্থার গাড়িও পার্কিং করে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে মুহাম্মদ সাইফুল নামে একজন সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সাইকেল ট্র্যাকটি তৈরি করা হয়েছিল সাইকেল চালকদের নিরাপদ চলাচলের জন্য। অথচ উদ্বোধনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই ট্র্যাকে দেখা গেল চার চাকার গাড়ির পার্কিং! আজ গাড়ি পার্কিং, কাল হয়তো হকারদের দখল, এভাবেই কি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে একটি সুন্দর উদ্যোগ?’
অনুষ্ঠানে যা বললেন মেয়র : উদ্বুদ্ধকরণ কমিটির কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মেয়র বলেন, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য, ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার জন্য নয়। কিন্তু আমরা নিজেরাই ফুটপাত দখল করে গাড়ি রাখছি, আবার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সমালোচনা করছি। এভাবে একটি শহরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
তিনি বলেন, শহরকে নিজের শহর হিসেবে মনে করে এর সম্পদ, পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিকদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জলাবদ্ধতাসহ নগরীর কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মেয়র বলেন, এই শহর শুধু আমার শহর নয়। এই শহরে আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন, আমরা আছি এবং আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানে বসবাস করবে। আমরা যতদিন পর্যন্ত মনে করতে না পারব যে এই শহর আমার, ততদিন সত্যিকার অর্থে শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখা সম্ভব হবে না। শহরের প্রতি এই মালিকানাবোধ ও দায়িত্ববোধ প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামোগত প্রকল্প দিয়ে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল–নালা ও ড্রেন পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি যেখানে–সেখানে ময়লা–আবর্জনা না ফেলা, নালা–নর্দমায় বর্জ্য না ফেলা এবং পানি চলাচলের পথ দখল বা বাধাগ্রস্ত না করার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনের কোনো উদ্যোগই পুরোপুরি সফল হবে না।
মেয়র বলেন, শুধু সচেতনতার কথা বললেই হবে না, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। মানুষ যখন দেখবে কোনো অনিয়মের জন্য জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন অন্যরাও আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হবে। গণসচেতনতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে আইনের প্রয়োগ ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
শাহাদাত বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক ডাস্টবিন স্থাপন করেছে। কিন্তু অনেক ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। নগরের কোনো সম্পদ চুরি হতে দেখলে সেটিকে নিজের সম্পদ মনে করে নাগরিকদের প্রতিবাদ করতে হবে। একইভাবে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো গাছ, স্থাপনা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করলে বা নিয়ে গেলে সেটিও প্রতিরোধ করা নাগরিকদের দায়িত্ব। কারণ এসব সম্পদ জনগণের টাকায় তৈরি। এগুলোর ওপর প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা বিনতে আমিন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক জাহিদুল আলম কচি ও চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অভীক ওসমান। স্বাগত বক্তব্য দেন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল হক।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫২ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় ২ লাখ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়রের নির্দেশনায় ৬ আগস্ট এ বিষয়ে ২০ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১০৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে।
এ কার্যক্রমের আওতায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, প্রচার অভিযান, বিতর্ক, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং গ্রিন অ্যাম্বাসেডর ঘোষণাসহ সাত দফা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি শ্রেণিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে সপ্তাহের পাঁচ দিন পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন, শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতার শপথ পাঠ, প্রতি মাসে দুইবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং প্রতি দুই মাসে অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে তার পরিবারে পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।












