ব্যাপক ধরপাকড়, উত্তাল দিল্লি

মমতাসহ ৪ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার, পরে ছেড়ে দেওয়া হয় । দীপকে ও ধ্রুব ছাড়া ৩ হাজার বিক্ষোভকারী মুক্ত । সিইসির পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ১১ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ সমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছে। এর মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করছে সিজেপি।

দিল্লিজুড়ে বিপুল পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়া হয়। সিজেপিসহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত দিল্লিতে অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটকে রাখতে স্টেডিয়ামগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার সিজেপির সমাবেশকে ঘিরে গ্রেপ্তারদের মধ্যে ভারতের চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আছেন। তারা হলেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এএপি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সিপিআইয়ের (এম) নেতা পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। দিল্লিতে গতকাল সকালে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও অল ইনডিয়া স্টুডেন্ট’স অ্যাসোসিয়েশনের নেহা বোরাকেও আটক করা হয়। দেশটির আরেক গণমাধ্যম এনডিটিভি ১৫০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করার খবর দিলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, দিল্লিতে আটক হয়েছেন অন্তত ৬ হাজার জন। খবর বিডিনিউজের।

এদিকে আন্দোলনে আটক হওয়া প্রায় তিন হাজার বিক্ষোভকারীকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মুক্তি পাওয়া আন্দোলনকারীদের তালিকায় অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। তবে সিজেপির শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা অভিজিৎ দীপকে ও ধ্রুব রাঠি এখনও পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

দিনভর উত্তাল পরিস্থিতি আর হাজারো বিক্ষোভকারীকে ধরপাকড়ের মধ্যে দিল্লির যন্তর মন্তরে উদ্দেশ্যে লং মার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি ও আন্দোলনকারী অন্যান্য যুব সংগঠন।

এর আগে সিজেপির সমাবেশে যোগ দিতে আসার চেষ্টা করতে থাকা এসব লোকজনকে দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের নয়া দিল্লির অনেকগুলো স্থানে আটকে রাখা হয়। সিজেপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লিজুড়ে ব্যাপক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তারা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড বসিয়ে অবাধ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিজেপিকে বিক্ষোভ সমাবেশের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

নেহা বোরার নেতৃত্বাধীন শিক্ষার্থীদের সংগঠন এআইএসএ যন্ত্রর মন্তর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাটের কাছে ধর্নায় বসার ঘোষণা দিয়েছিল। এখানে সমবেত হওয়া লোকজনকে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। পরে পুলিশের সূত্রগুলো জানিয়েছে, নারী ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের ছেড়ে দেওয়া হবে। আর নগরীতে মোতায়েন করা পুলিশ আজ রোববার পর্যন্ত একই অবস্থান বজায় রাখবে। গতকাল দিল্লি প্রায় চার স্তরবিশিষ্ট দুর্গে পরিণত হয়েছিল। যন্তর মন্তর অবধি পৌঁছতে পারলেও সেখানে অবস্থান করতে পারেননি কেউ। যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া।

ককরোচের বিক্ষোভের নেতৃত্বে অজিঙ্ক শিন্দ : দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভের আগে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও অন্যান্য শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব সংগঠনটির ইনচার্জ অজিঙ্ক শিন্দের কাঁধে বর্তেছে। গতকাল সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে একটি উড়োজাহাজ থেকে অভিজিৎকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে থাকা সিজেপির শীর্ষ নেতা সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কারাকেও আটক করে পুলিশ।

এনডিটিভি জানিয়েছে, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দীপকে দিল্লিতে তাকে আটক করা হতে পারে এমনটি আগেই অনুমান করেছিলেন, তাই সিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আটক হওয়ার পর আন্দোলন এগিয়ে নিতে শিন্দের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তিনি। গতকাল আগে থেকে রেকর্ড করা এক ঘোষণায় দীপকে জানিয়েছেন, অন্যান্য নেতা মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত শিন্দে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেবেন। উড়োজাহাজ থেকে দীপকে আটক হওয়ার কিছুক্ষণ পর তার ঘোষণার ভিডিওটি সিজেপির এঙ হ্যান্ডেলে পোস্ট করা হয়।

পোস্টে দীপকে বলেন, যদি আপনারা এই ভিডিও দেখতে থাকেন তবে জানাবেন, আমি, সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কারা গ্রেপ্তার হয়েছি। আমাদের অনুপস্থিতিতে অজিঙ্ক বিক্ষোভের ও সিজেপি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন। দয়া করে তাকে অনুসরণ করবেন।

দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া অব্যাহত রেখেছে। শুক্রবার রাত একটা থেকেই বিক্ষোভকারীরা দিল্লি যন্তর মন্তরের দিকে জড়ো হতে শুরু করেন। যন্তর মন্তরের দিকে যাত্রা করা বাসগুলো এবং দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।

ভারত ব্যানানা রিপাবলিক নয় : সিজেপির ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচি পণ্ড করতে দিল্লি ও আশেপাশের এলাকায় চালানো পুলিশের ব্যাপক অভিযানকে জনগণের জয় বলছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কর্মসূচি ঘিরে ধরপাকড়ের মধ্যে বিজেপির মুখপাত্র রবি শঙ্কর প্রসাদ বিরোধীদের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন, যার বড় অংশই লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটের সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে। তিনি বলেন, ভারত কোনো ব্যানানা রিপাবলিক নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এই দেশ কখনো মাথা নত করেনি, করবেও না।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে কথা বলেন বিজেপির মুখপাত্র। ভোটার তালিকায় পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতেই ওই আন্দোলন হচ্ছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বিদেশি বাণিজ্যিক স্বার্থের অস্বাভাবিক প্রভাব আছে–এমন রাষ্ট্র বোঝাতে একটি রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে ব্যানানা রিপাবলিক শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়।

শুক্রবার আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পুদুচেরিতে উপনির্বাচন হয়েছে। আন্দোলনের মধ্যেই এসব উপনির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর জয়ের প্রসঙ্গ টেনে কথা বলেন রবি শঙ্কর প্রসাদ। তিনি বলেন, শনিবার ও গত তিন দিনের ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, দেশ পরিচালিত হবে সংসদ দিয়ে, রাজপথ দিয়ে নয়। গত কয়েক দিন ধরে দিল্লিতে এসব অপচেষ্টা চলার মধ্যেই প্রতিটি নির্বাচন হয়েছে। বিজেপি বিশেষভাবে তুলে ধরতে চায়, বঙ্গ, আসাম ও পুদুচেরিতে চমৎকার সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দিল্লি ও দেশের অন্যান্য অংশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এক আন্দোলন চলছিল।

সরাসরি সিজেপির নাম না নিলেও কংগ্রেসের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা প্রতিবাদ বা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নই, তবে আপনারা নির্বাচনে টানা পরাজয়ের কারণে রাজপথের আন্দোলনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। পরাজিত ও হতাশাগ্রস্ত মানুষগুলো গত তিন–চার দিন ধরে দিল্লির সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে এবং রাজপথের আন্দোলনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে আমরা ভারতের জনগণের জন্য গর্বিত। তারা এই ষড়যন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ব্যর্থ করে দিয়েছে। চলমান আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো সমর্থন নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে শিক্ষার্থীদের একটি মতবিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নিতে চেন্নাইয়ে থাকা রাহুল গান্ধী পরে এঙে লেখেন, সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন। সব তরুণকে গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন। আমরা আপনাদের ঘিরে ফেলছি, আর পেছনে ফিরব না। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আগেই আমরা পেয়ে গেছি…। ভারতের তরুণ সমাজ, আমি তোমাদের জন্য গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যাও। আমরা তোমাদের পাশে আছি।

বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা : যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে লং মার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি ও আন্দোলনকারী অন্যান্য যুব সংগঠন। আন্দোলনকারীরা বলছেন তারা ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনায় বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না করা অথবা বরখাস্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রাখবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাইকেল ট্র্যাকে লরি ও কার
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা