শিল্পায়ন বাড়ছে, চিকিৎসা ও নিরাপত্তায় ঘাটতি

মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ২৫ হাজার শ্রমিকের ভরসা ৮৫ কিলোমিটার দূরের হাসপাতাল

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই | শনিবার , ১০ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

মীরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাড়ছে শিল্পকারখানা। সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনা। কিন্তু দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হলে সেখানে পর্যাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। আইনশৃক্সখলা রক্ষায় কিছু ব্যবস্থা থাকলেও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। এতে হতাশ শিল্পোদ্যোক্তা ও ভুক্তভোগীরা।

মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সমপ্রতি ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর একটি স্টিল মিলে চুল্লিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেনসহ চারজন দগ্ধ হন। এ ঘটনায় চীনা নাগরিকসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। এর আগে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোহাম্মদ হোসেন নামে এক ঠিকাদার নিহত হন। এ ঘটনায় সিএনজিচালকসহ কয়েকজন আহত হন। এর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় উপজেলা যুবদল নেতা কামালউদ্দিনও নিহত হন। এছাড়া সেখানে নানা ধরনের ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটছে। ৩৩ হাজার একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও কর্মসংস্থান বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকিও। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন এখানকার হাজার হাজার শ্রমিক ও বিনিয়োগকারী। শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি চিকিৎসা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা সেন্টার বা বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে বড় কোনো শিল্পদুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীদের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠাতে হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা বা অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও মীরসরাই সদরে যেতে হয় বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, এতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাসপাতাল থাকলে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এমন প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলছে এই শিল্পাঞ্চল। বর্তমানে এখানে ১৭টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। আরও ২৪টি কারখানা নির্মাণাধীন। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক এখানে কর্মরত। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে শ্রমিকদের আবাসন, বাজার, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে আশপাশের ইছাখালী, কাটাছড়া, মিঠানালা, মঘাদিয়া, সাহেরখালী ও মায়ানী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। দ্রুত বদলে যাচ্ছে সাগরপাড়ের জনপদের চিত্র। বাড়ছে জনসংখ্যা ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ। স্থানীয় শিল্প পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রায়সুল ইসলাম বলেন, শিল্পাঞ্চলের বিশাল আয়তনের সঙ্গে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। তাই এখানে দ্রুত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চমেক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. প্রদীপ জানান, দগ্ধ বা আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাছাকাছি ট্রমা ও বার্ন চিকিৎসাসেবা থাকলে মৃত্যুর হার অনেক কমানো সম্ভব।

বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা জানান, শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘ সড়কে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, ট্রাফিক সংকেত, সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তাচৌকি স্থাপনও জরুরি।

এ বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন বেজার পরিচালক সালেহ আহমদ। তিনি বলেন, উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তা কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়। তবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ও ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও জনবল এবং উন্নত যানবাহন প্রয়োজন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফিরে পেল প্রাণ, সচল হোক ক্যাবল কার
পরবর্তী নিবন্ধঅন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়তে সবার জন্য জায়গা খুঁজছি