গাড়ি থেকে নেমেই কানে ভেসে আসে পাহাড়ি বনের চেনা গুঞ্জন আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড়, ঠিক মাঝখানে বিশাল কৃত্রিম লেক আর তার চারপাশ ঘিরে থাকা ছায়াঘেরা মেঠো পথ–সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত ‘এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্ক’ যেন প্রকৃতির এক নিভৃত ঠিকানা।
জানা যায়, নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নতুন ইজারাদারের অধীনে নব উদ্যোমে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ৫২০ একরের এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল। তবে অপার সৌন্দর্যের এই পার্কে এসেও দর্শনার্থীদের মনে রয়ে গেছে একটু আক্ষেপ; পাহাড়ের বুক চিরে চলা জনপ্রিয় ক্যাবল কারটি আজও অচল হয়ে পড়ে আছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম–কাপ্তাই সড়কের দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুর এলাকায় এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের অবস্থান। যেটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর। দর্শনার্থীদের জন্য পার্কটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে আকর্ষণীয় সব আয়োজনে। মূল ফটকে গাছের আকৃতিতে তৈরী বিশাল গেটের উপর কৃত্রিমভাবে বসানো হয়েছে বিভিন্ন পাখির অবয়ব। মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুবিশাল কৃত্রিম লেক। যেখানে পর্যটকদের জন্য শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে রোমাঞ্চকর কায়াকিং সুবিধা। স্বচ্ছ জলে নৌকা বা কায়াক ভাসিয়ে সবুজ পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করবে। এ ছাড়া পার্কের বনাঞ্চলে রয়েছে হরেক রকমের দেশি–বিদেশি পাখির কিচিরমিচির, বার্ড গ্যালারি, ওয়াচিং টাওয়ার এবং শিশুদের বিনোদনের জন্য বিশেষ চিলড্রেন কর্নার। পরিবার বা দলবেঁধে পিকনিক করার জন্যও এটি এখন একটি আদর্শ স্থান। এখানে আলাদা গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, রান্নার আলাদা ব্যবস্থা, বিশাল পার্ক মসজিদ, ভেতরে রেস্টুরেন্টে পাহাড়ি স্বাদের খাবার ব্যবস্থাসহ পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘন সবুজ বনাঞ্চল আর পাখির কিচিরমিচির শব্দ যেকাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
চট্টগ্রাম নগরী থেকে সপরিবারে ঘুরতে আসা বিউটি আক্তার বলেন, পার্থিব ব্যস্ততা ভুলে এখানকার নিরিবিলি পরিবেশ আর হরেক রকমের পাখি মন জুড়িয়ে দিয়েছে। তবে তাঁর মতো অনেক পর্যটকেরই আক্ষেপ, পার্কের মূল আকর্ষণ সেই ক্যাবল কারটি চালু থাকলে আনন্দ দ্বিগুণ হতো।
সুত্রে আরও জানা যায়, একসময় পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ এই ক্যাবল কার। মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে পাহাড়ি বনাঞ্চল পেরিয়ে সাত মিনিটের এই যাত্রায় দর্শনার্থীরা আকাশপথে পাহাড়ের রূপ উপভোগ করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সৃষ্ট সহিংসতা ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্যাবল কারটি। দুই স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের মোটর, সার্কিট বোর্ডসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ লুটপাট আর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কারিগরি মূল্যায়ন ও এটি মেরামতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মতো প্রয়োজন হওয়ায় বর্তমানে তা অর্থসংকটে আটকে আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
পার্কের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও ইজারার বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের বন কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পার্কটি ইজারা দেওয়ার পর থেকে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ–সুবিধা অনেক বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন।
পর্যটকরা বলছেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লেকের জলরাশি আর আধুনিক সুযোগ–সুবিধার ছোঁয়ায় ইকোপার্কটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।তবে ১৭ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্যাবল কারটি দ্রুত চালু করা গেলে এটি দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে–এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় ও ভ্রমণপিপাসুদের।











