জলে পড়লেই মানুষ মরে না, মারা যায় সাঁতার জানে না বলে। ঠিক একইভাবে সমস্যায় পড়লেই মানুষ ভেঙে পড়ে না, ভেঙে পড়ে যখন আর সমস্যাগুলো ঠিক সামলে উঠতে পারে না। প্রতিদিন হাজারো কাজ, হাজারো দায়িত্ব আর তার সাথে হাজারো চ্যালেঞ্জ! দিব্যি চলে যায় দিন এতোসব সামলেও। হঠাৎই একটা কোথাও জট বেঁধে যায় আর অমনি পরের সবগুলো ধাপ জটিল হয়ে গেলো। এমনটা আমাদের জীবনে হর হামেশাই ঘটে চলেছে। ছোট ছোট জটিলতা, মানসিক চাপ পরস্পর যুক্ত হয়েই বড় একটা উদগীরণ হয়। এলাকার সবচেয়ে হাসিখুশি মেয়েটা আত্মহত্যা করার পর আমরা জানতে পারি তার মানসিক সমস্যা ছিলো, কোন আত্মীয় স্ট্রোক করলে জানা যায় তার কত রকম মানসিক চাপ ছিলো –এই জানাটুকু যদি সময়ে জানা যেতো তাহলে হয়তো চিত্রটা অন্যরকম হতো। কখনো সম্মানের ভয়ে, কখনো সামাজিক দূরত্বের কারণে মানুষ নিজেকে উদারভাবে মেলে ধরতে পারে না। নিজের মনে রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, অনুশোচনা পুষে রাখতে রাখতে এক সময় আর নিজেকেই ধরে রাখতে পারে না। সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো ‘সবাই পাগল ভাববে’ এরকম একটা ভ্রান্ত ধারণা থেকে মানুষ সাইকোলজিস্টের শরণাপন্নও হয় না। প্রতি বছর ১০ অক্টোবর ঘটা করে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা দিবস পালিত হয় কিন্তু আমরা সচেতন হই না। ১৯৯২ সালে ডব্লিউ এফএম এইচ মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্য নিয়ে দিবসটি প্রবর্তন করেছিলো। বর্তমানে সবচেয়ে বড় কুসংস্কার এটাই ‘সাইকোলজিস্টের কাছে গেলে মানুষ পাগল ভাববে’। এজন্যই বলে– ব্যাধির চেয়ে আঁধি হলো বড়! আমার সুস্থ থাকা, শান্তিতে জরুরি না, জরুরি ‘কেউ পাগল ভাববে’ সেটা নিজে নিজে ভেবে নিয়ে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়া! আজ সমাজের সামগ্রিক অস্থিরতার পেছনেও কোথাও না কোথাও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবই কাজ করছে। আমরা নিজেরা শান্তি পাচ্ছি না, সেই অশান্তি অন্য কারো উপর ঢেলে দিচ্ছি। মানসিক সমস্যা এমন একটা বিষয় যার ভেতরে সমস্যা আছে সে নিজে বুঝতে পারে না। আশপাশের মানুষ হয়তো বুঝতে পারে কিন্তু কিছু করতে পারে না। এভাবেই বিষয়টা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের বড় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশি নব্বইয়ের দশকে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে আমরা সমস্যা বলে মনে করতাম। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাঠকর্মীরা কাজ করেছেন, বিনামূল্যে জন্মনিরোধক উপকরণ সরবরাহ করেছেন। ইচ্ছা করলে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও সেবা দানের ব্যবস্থা একইভাবে হতে পারে। কিন্তু পরিতাপের ব্যাপার হলো সমাজের এই চরম অস্থিরতার মাঝে থেকেও আমরা এটাকে কোন সমস্যা বলে মনে করছি না। যারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন তাঁদের পক্ষে এই সংকট বুঝতে পারা কিন্তু অনেক সহজ। বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রসঙ্গে তারাই আমাদের ‘ফ্রন্টিয়ার’, তারা যদি নিজ থেকে এগিয়ে এসে উদ্যোগ গ্রহণ না করেন তবে আমাদেরই নিজ প্রয়োজনে তাঁদের ডেকে আনতে হবে। সামাজিক জীবনে আমরা অনেক আত্মীয় স্বজন দেখি যারা আমাদের খোঁজ খুব একটা রাখেন না কিন্তু আমরা যদি উপযাচক হয়ে যোগাযোগ করি তারা কিন্তু সাথে থাকেন। তাদেরকে নিজেদের প্রয়োজনে আমরা বাড়িতে দাওয়াত করে নিয়ে আসি, ভালো ভালো খাবার খাওয়াই, তারপর নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলি। এই খাওয়ানোর আয়োজনে কিছু আত্মীয় প্রতিবেশী আবার নিজ থেকেই সাহায্য করতে চলে আসেন, তারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে সাহায্য করে, আমরা তাদের বিনিময়ে কী দিলাম তা নিয়ে ভাবে না। সেরকমই দেশের দশের প্রয়োজনে কেউ কেউ নিজের উদ্যোগে চলে আসেন তাদের ডেকে আনতে হয় না। যেমন: বিভিন্ন সময়ে ডাক্তার ভাই বোনরা এগিয়ে আসেন, মেডিকেল ক্যাম্প করেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, আমরা গুরুত্ব দিই না। ভাবি ‘আরে সামান্য প্রেসার, ডায়বেটিস মাপার জন্য এতোক্ষণ লাইনে কে দাঁড়ায়!’ অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা সামাজিক ত্রুটি বিচ্যুতি ধরিয়ে দিতে আসেন, আমরা বিরক্ত হই। তবু তারা থেমে থাকেন না, বার বার আসেন, ক্ষেত্রবিশেষে উপযাচক হয়ে সাহায্য করতে চলে আসেন – হয়তো কখনো কর্তব্যের খাতিরে, কখনো মানবতার খাতিরে! তারা আমাদের সেই সব প্রতিবেশীদের মতো আপনজন। আমরা আশাবাদী যে সমাজের ব্যাধিটুকু তারাই সময়ে সামলে নেবেন কিন্তু আঁধির ব্যাপারে আমাদের নিজ উদ্যোগে তাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসতে হবে যারা এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী। কারণ তাঁরাই পারেন আমাদের চার পাশের মানসিকভাবে উদভ্রান্তদের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে। ব্যাধি এবং আঁধিমুক্ত সুষ্ঠু সমাজের জন্য সমাজের সকলের আন্তরিক সমন্বয় দরকার।












