পেশাগত জীবনে শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন

| সোমবার , ৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ। বিশ্বের সমস্ত শিক্ষকদের অসামান্য অবদান স্মরণ করতে এই দিবস উদযাপন করা হয়ে থাকে। ১৯৯৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবর দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের সরকার ও এডুকেশনাল ইন্টারন্যাশনাল–ইআই সহ ৪০১টি শিক্ষক সংগঠন প্রতি বছর ঘটা করে দিবসটি পালন করে থাকে। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে– জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিক্ষকদের মর্যাদা ও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা, মানসম্মত শিক্ষা তথা সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করা এবং প্রবীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাকে জানা ও কাজে লাগানো।

ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকরা বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা, উপলব্ধি সৃষ্টি ও শিক্ষকদের ভূমিকার স্বীকৃতিস্মারক হিসেবে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক বিপর্যয় বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত হয়েও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকরা তাদের ভূমিকা রেখে চলেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষা প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে এগিয়ে নেয়ায় অনুপ্রেরণাদানকারী ব্যক্তি। জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের অংশগ্রহণ মানুষকে আলোকিত হতে সাহায্য করে। কোনো বিষয় চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষক ধারণা ও জ্ঞান অর্জন করে এবং ঐ জ্ঞানের জ্যোতির দ্বারা নিজে আলোকিত হতে ও সমাজকে জ্যোতির্ময় করতে সহায়তা করে। শিক্ষকের ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই শিক্ষার্থীর মন–মনন, মানসিক উৎকর্ষ সাধন হয়, আচার আচরণ, মন ও আত্মার ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন ঘটে, মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, শিক্ষক সভ্যতার অভিভাবক, সমাজের অভিভাবক। কার্যত শিক্ষক বলতে একজন আলোকিত, জ্ঞানী–গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত পণ্ডিত ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সভ্যতার বিবর্তনের অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষা দিতে নিবেদিতপ্রাণ সেবক, ব্যবসায়ী নন। তিনি তাঁর আচার–আচরণ, মন ও মননে নিজেই বটবৃক্ষের প্রতীক। তাঁর সাফল্যের ভিত্তি হল পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা, নির্মল চারিত্রিক গুণাবলি, জ্ঞান সঞ্চারণে আন্তরিক সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা। তাই শিক্ষক বলতে এমন এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ববান জ্ঞানী, গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তিকে বোঝায়; যিনি শিক্ষার্থীকে শিখন প্রক্রিয়ায়, জ্ঞান অন্বেষণ ও আহরণে, মেধা বিকাশ ও উন্নয়নে, শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে, নৈতিক ও মানসিক গুণাবলি অর্জনে এবং সমাজ বিবর্তনে অনুঘটক ও সুশীল সমাজ তৈরির সহায়তা দানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্বমানের শিক্ষক তৈরী করতে হলে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হওয়ার প্রবণতা থেকে শিক্ষকদের বের করে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য পরিকল্পনামাফিক শিক্ষক গড়ে তুলতে হবে। তারপরে শিক্ষকতায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এখানেই থেমে গেলে হবে না। পেশাগত জীবনের প্রতিটি শিক্ষকের যথেষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোনো শিক্ষক যদি কোনো ভালো কাজ করেন তাহলে তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলে স্থানীয় রাজনীতি ও দুর্নীতি হতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছুটা মুক্তি পাবে। শিক্ষকদের যথাযথ প্রেষণার ব্যবস্থা করতে হবে। ছোটবেলা হতে শিক্ষকতাকে ভালোবেসে এবং শিক্ষকতার স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করে শিক্ষকতা পেশায় এসে কোনো শিক্ষক যেন হতাশ না হয়; তার জন্য শিক্ষা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্বপ্নবাজ এসব শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় ধরে রাখতে না পারলে ঘটনাচক্রেই সবাই শিক্ষক হবে। তখন শিক্ষার মান যা হওয়ার তাই হবে। তাঁরা বলেন, বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিক্ষা খাত সময়ের সেরা বিনিয়োগের ক্ষেত্র। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। ভারতের নোবেল বিজয়ী শিক্ষাবিদ কৈলাশ সত্যার্থী বলছেন, শিক্ষায় ১ ডলার বিনিয়োগ করলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে ১৫ গুণ রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী মূল্যায়নের মাধ্যমে এই পেশায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হবে। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা শিক্ষার উন্নয়নে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদেরও বদলাতে হবে প্রতিনিয়ত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে