টং ঘর থেকে দিনরাত পাহারা, নিরাপদে বেড়ে উঠছে দুই হাজার চারা

রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর লাগানো একটি তেলি গর্জনও চকরিয়ায় দখল থেকে রক্ষা পেল ৫ একরের সংরক্ষিত বনভূমি

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান সরকার পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় নির্বাচনি ইশতেহারে। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাটের রিংভং থেকেই এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চলতি বছরের ১৩ জুন কক্সবাজার সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতেই রোপণ করেন আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত তেলি গর্জন গাছের চারা। গর্জনের তিন প্রজাতির মধ্যে তেলি গর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। এটি মূলত উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চির সবুজ বা আধা সবুজ বনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ। তাই এখানে প্রধানমন্ত্রী তেলি গর্জনের চারা রোপণ করেন। এছাড়াও সেখানে ১০ প্রজাতির দুই হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়। তদ্মধ্যে রয়েছে ঢাকিজাম, জাম, চাপালিশ, দারমারা, চম্পা, নিম, সিভিট, বৈলাম, ছাতিয়ান ও তেলসুর।

একইদিন ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শনের সময় মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই বাঁম পাশেই প্রধানমন্ত্রী রোপণ করেন শোভাবর্ধনকারী ‘নাগালিঙ্গম’ বৃক্ষ। দুর্লভ ও বেশ আকর্ষণীয় এই নাগালিঙ্গম বৃক্ষের আদিনিবাস হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকায়। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে– নাগালিঙ্গম বিশাল আকারের শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ। দুর্লভ এই বৃক্ষের ফুল বেশ আকর্ষণীয় এবং এই বৃক্ষের ফল হাতির প্রিয় খাদ্য। এই বৃক্ষের আদিনিবাস দক্ষিণ আমেরিকায় হলেও এটি বাংলাদেশ, হাইতি, হন্ডুরাস, ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে তেলি গর্জন দেশের অন্যতম উঁচু বৃক্ষ। উচ্চতায় এই গাছ ৩৫ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ায় এ গাছ পাওয়া যায়। তেলি গর্জন পাহাড়ি এলাকায় মাটির ক্ষয়রোধে বেশ ভূমিকা রাখে। দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের ক্ষয়িষ্ণু বনে তেলি গর্জন জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় হিসেবেও কাজ করে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন এই প্রজাতির গাছটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

বনবিভাগ ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত দিয়ে রোপণকৃত তেলি গর্জন ও নাগালিঙ্গম চারাগাছসহ ওইদিন সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় এখানে রোপণকৃত আরও ১০ প্রজাতির দুই হাজার গাছের চারা যাতে নির্বিঘ্নে বড় হতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সরজমিন দেখা গেছে, ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই বাঁ পাশে রোপিত নাগালিঙ্গম চারাটির চারিদিকে বেস্টনী দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিদিন নিয়ম করে এই গাছের পরিচর্যা করা হচ্ছে। এই চারা রোপণের ইতোমধ্যে সাড়ে তিনমাস পার হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে রোপিত এই গাছ স্ব–মহিমায় বেড়ে উঠছে। অপরদিকে মালুমঘাটের রিংভং এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে– প্রধানমন্ত্রীর নিজ হাতে রোপিত তেলি গর্জন গাছ ছাড়াও এখানে রোপিত আরও ১০ প্রজাতির ২ হাজার গাছের চারাও বেশ নিরাপদে বড় হচ্ছে। কঙবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণাধীন ডুলাহাজারা বনবিটের মালুমঘাট রিংভং এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির সমতল জায়গায় এসব গাছ রোপণের মধ্য দিয়ে দখলবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে প্রায় ৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর কঙবাজার আগমনের কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়ক এবং রেললাইনের মাঝখানে মালুমঘাটের সংরক্ষিত বনভূমির সমতল এই জায়গা দখলে নিয়ে সেখানে রাতারাতি অসংখ্য ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে। বনবভিাগ সেই ঝুপড়ি ঘর গুঁড়িয়ে দিলেও ফের সংরক্ষিত বনভূমির বিপুল পরিমাণ জায়গা দখলে নেওয়া সংক্রান্তে তথ্যচিত্র সংগ্রহে গেলে প্রতিবেদক ছোটন কান্তি নাথের ওপর হামলে পড়ে দখলবাজ–সন্ত্রাসীরা। এ নিয়ে দৈনিক আজাদীতে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা দৃষ্টিগোচর হয় সরকারের। এরপর সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয় এখান থেকেই সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। অবশেষ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ গত ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর নিজ হাতে চারা রোপণের মধ্য দিয়ে সারাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা হয় এখান থেকেই।

ডুলাহাজারা বনবিট কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আমিন দৈনিক আজাদীকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত দিয়ে রোপিত তেলি গর্জনসহ ওইদিন রোপিত ১০ প্রজাতির ২ হাজার চারা গাছের পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন পাঁচজন শ্রমিক। তাদের নিয়মিত কাজ হচ্ছে– রোপিত চারাগাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে তা দেখভাল করা এবং আশপাশের মানুষের চলাচলের পাশাপাশি গরু–ছাগল যাতে সেখানে ঢুকে চারাগাছ বিনষ্ট করতে না পারে তা লক্ষ্য রাখা। এমনকি রাতের বেলায়ও যাতে পাহারা থাকে সেজন্য আম গাছের ওপর তাদের জন্য মাচা বা টং ঘরের মতো করে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

কঙবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিজ হাতে রোপিত তেলি গর্জনসহ সেখানে রোপিত সব গাছের চারার পরিচর্যা ও নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে নিয়মিত পরিচর্যাও করা হচ্ছে চারাগাছের। প্রধানমন্ত্রীর রোপিত তেলি গর্জন চারার সুরক্ষায় চারপাশে দেওয়া হয়েছে বাঁশের বেড়া। ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে পরিচিতিফলক। সেখানে গাছটির বৈজ্ঞানিক পরিচিতির পাশাপাশি রোপণকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। একইসাথে পুরো বনায়ন এলাকাকে চতুর্পাশে গাছ–বাঁশের খুঁটি দ্বারা শক্ত বেস্টনীও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

বনায়ন পাহারায় নিয়োজিত পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে আবুল হোসেন ও নুরুল ইসলাম জানান, তারা পালাক্রমে এসব গাছের পরিচর্যার পাশাপাশি আশপাশের মানুষ ও গরু–ছাগল যাতে ক্ষতি করতে না পারে সে ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এতে চারাগুলো দিন দিন নিরাপদে বেড়ে ওঠছে।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সপরিবারে সাফারি পার্ক পরিদর্শনের সময় রোপিত শোভাবর্ধনকারী নাগালিঙ্গম বৃক্ষের পরিচর্যায় আমরা সচেষ্ট রয়েছি। পার্কে রোপিত এই বৃক্ষের যত্ন–আত্তি করতে পার্কের কর্মীদের নিয়োজিত রাখা হয়েছে। শক্ত বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত রাখা হয়েছে এই গাছকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশকে উন্নত করার জন্য আমি কী করছি?
পরবর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় সওজের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ