কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসনের স্বপ্ন পূরণে নগরের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হয় একটি মহিলা শ্রমজীবী হোস্টেল ও ৫ শয্যার হাসপাতাল সুবিধাসহ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র। ২০২২ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এটির। এরপর চার বছর পার হলেও চালু হয়নি এই শ্রমজীবী মহিলা হোস্টেলটি। দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে সরকারি এ অবকাঠামো। এতে অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের। পাশাপাশি নিরাপদ আবাসনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন লাখ লাখ কর্মজীবী নারী।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল ১১৫ কোটি ৭ লাখ টাকায় একনেকে অনুমোদন হয় ‘নারায়ণগঞ্জ বন্দরে এবং চট্টগ্রাম কালুরঘাটে মহিলা শ্রমজীবী হোস্টেল এবং ৫ শয্যার হাসপাতাল সুবিধাসহ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র’ প্রকল্পের। এর মধ্যে ৫৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে কালুরঘাটে মহিলা শ্রমজীবী হোস্টেল এবং ৫ শয্যার হাসপাতাল সুবিধাসহ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের জুনে এর কাজ শেষ হয়। ১ দশমিক ০১ একর জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে শ্রম অধিদপ্তর।
জানা গেছে, কালুরঘাটে মহিলা শ্রমজীবী হোস্টেল ভবনটি ৬ তলা বিশিষ্ট। এতে ২৩২টি কক্ষ আছে। প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় শ্রম অধিদপ্তরের জানায়, ভবনটিতে ৪ বেড, ২ বেড ও সিঙ্গেল বেডের আলাদা আলাদা কক্ষ থাকবে এবং ৯১০ জন শ্রমজীবী ব্যাচেলর মহিলা স্বল্প ব্যয়ে বসবাস করার সুযোগ পাবেন। এছাড়া ৫ শয্যার হাসপাতালে দুইজন চিকিৎসক, নার্স ও কম্পাউন্ডার থাকার কথা। তবে, নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে ভবনটি বুঝে নেয়নি শ্রম অধিদপ্তর। ফলে চালু করা যায়নি হোস্টেলটি।
এদিকে গতকাল শুক্রবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমজীবী হোস্টেল ও শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান। এ সময় দেখা গেছে, অযত্নে–অবহেলায় পড়ে থাকা ভবনটির বেহাল দশা। ভবনের দেয়ালে রয়েছে বড় বড় ফাটল। মেঝেতে ছিল ধুলোবালি ও ময়লা। বিভিন্ন সময়ে সেখানে চুরির ঘটনা ঘটে বলেও জানা গেছে।
পরিদর্শনে গিয়ে হোস্টেলটির বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমার মনে হচ্ছে এটা আনপ্ল্যান ওয়েতে (অপরিকল্পিতভাবে) করা হয়েছে। বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। ভবনের কাজের অনেক ত্রুটি রয়েছে। তাছাড়া এটা শ্রম মন্ত্রণালয় রিসিভ করতে চাচ্ছে না। এই নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এখানে (কালুরঘাট শিল্প এলাকায়) দুই লক্ষ মহিলা শ্রমিক কাজ করে। শ্রমজীবী এসব মহিলাদের জন্য আমরা কী করতে পারি এবং এই ভবন নিয়ে কী করণীয় সবকিছু নিয়ে এই এলাকার সংসদ ও মেয়র; দুইজনকেই ঢাকায় ডেকেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট সেনাকল্যাণ অথরিটিসহ বসে সিদ্ধান্ত নেব। আমরা কালক্ষেপণ করব না।
মন্ত্রীর পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও। তিনি আজাদীকে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার মেগা প্রকল্পের নামে যে মেগা দুর্নীতি করেছে এটা তার প্রমাণ। নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে মাত্র চার বছর, এর মধ্যেই ফাটল ধরেছে দেয়ালে। হোস্টেলের যে বেড সেটা করা হয়ে সিমেন্ট দিয়ে, এটা দেখে মন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করেছেন। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বেডে থাকা আর ফ্লোরে থাকা তো একই কথা। যাই হোক এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, হোস্টেলটি চালুর বিষয়ে খুব শীঘ্রই একটি মিটিং হবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক, স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আমি এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার থাকবেন মিটিংয়ে।
পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ–মহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান জানান, ২০২২ সালে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও করতে পারেনি। পরের ২০২৪ সালে হস্তান্তরের কথা থাকলেও হস্তান্তরের সময় কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে।
এদিকে সম্প্রতি হোস্টেলটির দুর্দশা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। তিনি বলেন, ৫৯ কোটি ৩৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় শ্রমজীবী হোস্টেল ও শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটি নির্মাণ হয়েছে। ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ হলেও দুঃখের বিষয় হচ্ছে– ২৩২ রুম অব্যবহৃত ও ২৮টি কক্ষ অসম্পূর্ণরুপে পড়ে আছে। বর্তমানে এটি ভুতুড়ে স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া এটি মাদকসেবীদের জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। এটা দেখভালের জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব না নেয়ায় সখানে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
এরশাদ উল্লাহ আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে এখানে বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়েছে, তাই সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনগণের টাকায় নির্মিত এ স্থাপনা থেকে শ্রমজীবী মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না। একইসঙ্গে সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে।













