রেলসেবার মান বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা

| শুক্রবার , ২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

রেল ভ্রমণ বিশ্বব্যাপী সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে পরিবহন খাতে ট্রেন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাতায়াত থেকে শুরু করে মালামাল পরিবহন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম হলো রেল খাত। সময়ের পরিক্রমায় এ দেশে রেলের পরিসর বহুগুণ বেড়েছে। বিগত সময়ে এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে। যদিও রেলওয়ের সেবার মান আজও আশানুরূপ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীতে ‘রেলে বহর বাড়ছে, বাড়ছে না মেরামত সক্ষমতা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, রেলওয়ের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর বাড়ছে নতুন নতুন কোচ ও ওয়াগনের সংখ্যা। কয়েক বছর পরপর যুক্ত হচ্ছে ইঞ্জিন। প্রতি বছরই বাড়ছে নতুন নতুন রেলপথের সংখ্যা। নতুন জেলার সঙ্গে সংযোগ হচ্ছে। সেই সাথে পর্যটন নগরীগুলোর সঙ্গেও রেলপথের সংযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। নতুন নতুন রেলপথ এবং রেলের কোচ–ওয়াগন বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না মেরামত সক্ষমতা। পুরনো কারখানায় পুরনো যন্ত্রপাতিতে কোচ, ওয়াগন ও ইঞ্জিনের কাজ চলছে পুরনো পদ্ধতিতে। বছরের পর বছর মেরামত ও সংস্কার করে পুরনো যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক কাজ করতে হচ্ছে পুরনো পদ্ধতিতে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে রেলওয়ের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পণ্য পরিবহন হলেও বাংলাদেশে ঠিক এর বিপরীত চিত্র। যে সংস্থাটি মাত্র ২৫টি মালবাহী ট্রেনের সঠিক পরিচালন ও সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, অদূরদর্শিতা ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে তা ভয়াবহ লোকসানে হাবুডুবু খাচ্ছে। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয়েছে মাত্র ১৫০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে গুনতে হচ্ছে প্রতিবছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের লোকসান। সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে এভাবে অকার্যকর করে রাখা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক কঠিন আঘাত।

বিগত ১৮ বছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও পণ্য পরিবহণের আয় বেড়েছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকা। আয়ের ওপর জোর না দিয়ে নতুন নতুন প্রকল্পের নামে অদরকারি ও অবাস্তব কেনাকাটায় আগ্রহ দেখা গেছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় কেনা লাগেজে ভ্যান ও স্পেশাল ট্রেন আজ রেলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে; অথচ এই অর্থে ১৮টি নতুন ইঞ্জিন কেনা সম্ভব হতো, যা দিয়ে চালু করা যেত ৩০টি মালবাহী ট্রেন। বর্তমানে ৭৫ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পণ্যবাহী ট্রেন, যার প্রভাবে কনটেইনার পরিবহণ কমে গেছে প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে কমলাপুর আইসিডির জরাজীর্ণ দশা এবং অসাধু চক্রের সঙ্গে সড়ক পরিবহন মালিকদের অনৈতিক আঁতাত রেলে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ও অবকাঠামো, দ্রুতগতির ট্রেন, সময়মতো চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান উন্নত করে বহু দেশ তাদের রেল যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। রেলওয়ের উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন ও কোচের ওপর নির্ভরতা কমানোর পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়। বস্তুত সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও এসব খাতে অগ্রগতিও দৃশ্যমান নয়। যেসব দেশের রেলওয়ে স্বাবলম্বী, সেসব দেশে সেবার মান বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ খাতে গুরুত্ব না বাড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে কতটা লাভের মুখ দেখবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

তাঁদের মতে, সাধারণত রেলসেবা হিসেবে জনগণের আকাঙ্ক্ষা থাকে বিনা ভোগান্তিতে ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তি, পরিচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেন, স্বাচ্ছন্দ্যে ট্রেনযাত্রা। কিন্তু এ সাধারণ বিষয়গুলো আজ পর্যন্ত কোনো সরকার এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও রেল সেবার মান উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দীর্ঘ সময় কিংবা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল না। পরিচালন ব্যয় বাড়ানোরও তেমন আবশ্যকতা ছিল না। কেবল দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বিদ্যমান সেবাগুলোর মান বাড়ানো যেত। এতেই যাত্রী ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল। রেলসেবার মান বাড়াতে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা। তাহলে সমস্ত ঘাটতি পূরণ করে রেলওয়ে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশ্রমিকদের আবাসন, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম থেকেই উদ্যোগ
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬