প্রত্যেক দেশের একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকে। এ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নাম এক এক দেশে এক এক রকম। প্রতিটি দেশের মুদ্রানীতির মধ্যেও যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি প্রতি দেশের বিনিময়ের মাধ্যম তথা অর্থ ভিন্ন হয়। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা অর্থের নামও ভিন্ন হয়। যেমন– বাংলাদেশে বলা হয় ‘টাকা’, ভারতে বলা হয় রুপি, আমেরিকায় বলা হয় ডলার, যুক্তরাজ্যে বলা হয় পাউন্ড স্টার্লিং ইত্যাদি। যখন এক দেশের সাথে অন্য দেশের অর্থ লেনদেনের প্রয়োজন হয় তখন এক দেশের সাথে অন্য দেশের মুদ্রার নাম ও মুদ্রার মান ভিন্ন হওয়ার কারণে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ব্যবহার করে লেনদেন করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমগ্র বিশ্বে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আমেরিকার ডলারকে। অর্থাৎ ইউএস ডলার। পৃথিবীর আরো কয়েকটি দেশের মুদ্রার নাম ডলার আছে। তবে ইউএস ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ইউএস ডলারকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
একটি দেশ নিজ দেশের প্রয়োজনীয় সকল পণ্য উৎপাদন করতে পারে না। যে সব পণ্য উৎপাদনে পর্যাপ্ত উপাদান পাওয়া যায় এবং উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, সেই দেশসমূহ সেই সব পণ্য উৎপাদন করে এবং অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। এভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু এক এক দেশের মুদ্রা ও মুদ্রার মান ভিন্ন হবার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আন্তর্জাািতক মুদ্রাকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন সম্পন্ন করতে হয়। এভাবে ইউএস ডলার হয়ে উঠেছে সমগ্র বিশ্বের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান লেনদেনের মাধ্যম। যে সময় থেকে ইউএস ডলার লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে সেই দিন থেকে প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তথা ইউএস ডলারকে সঞ্চয় করতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সঞ্চয়কে বলা হয় ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ।’ একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এ রিজার্ভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো জরুরী প্রয়োজনে বিদেশ থেকে যে কোনো পণ্য আমদানি করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার ব্যয় করে আমদানি করতে হয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড হয় কৃষি। বিভিন্নভাবে অধিকাংশ লোক যেমন কৃষিতে জড়িত তেমনি এদেশের জনগণের খাদ্যের জোগানদার হয় কৃষি। হঠাৎ করে বাংলাদেশে ঝড়, তুফান, বন্যা, খরা– এরূপ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিলে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়। এমনিতে প্রতি বছর বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ হয় কমবেশি ২০ লক্ষ টন। এরূপ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য ঘাটতি আরো অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় যদি যথাসময়ে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা না যায় তবে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অতি দ্রুত খাদ্য আমদানি করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু খাদ্য আমদানির জন্য যদি পর্যাপ্ত বিনিময়ের মাধ্যম তথা ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে জমা না থাকে তবে আমদানি করা সম্ভব নয়। তখন দুর্ভিক্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় দুই খাতের আয় থেকে। এদের একটি হচ্ছে প্রবাসী আয় তথা রেমিট্যান্স এবং অন্যটি হচ্ছে রপ্তানি আয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে জমা হয়েছে। বলা যায়, প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। তবে ২০২৬ সালের জুন থেকে এ আয় আসা কিছুটা হ্রাস পেলেও, একটি বিষয় আশান্বিত করেছে যে, ইরান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও রপ্তানি আয়ের গতি যথাযথ রয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছেও বলা যায়। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবাহে রিজার্ভ আরো শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম–৬ পদ্ধতিতে এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২২৬ কোটি ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা যে ভাল হবে তেমন কোনো কথা নয়। কারণ রিজার্ভ থেকে সরকারকে বহুমুখী বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিদেশ থেকে যে পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে তা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়। বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ সরকারকে বহন করতে হয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৫০ কোটি ডলার যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে গেছে। আগামী বছরগুলোতে এই চাপ আরো বাড়বে। কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শীঘ্রই শুরু হওয়ার কথা। তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ পরিশোধ করতে হবে জাপানকে। অন্যদিকে কর্ণফুলি নদীর তলদেশে নির্মিত ট্যানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তাছাড়া দুর্বল ব্যাংকখাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি এবং সাম্প্রতিক তীব্র জ্বালানি সংকট, অর্থনীতিতে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না হলে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা থাকে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ পায় না। বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। সার্বিকভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয় না। বরং শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারায়। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আর একটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রদত্ত তথ্যে দেখা যায়, এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য–উপাত্তে দেখা যায়, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত ১৪ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে এখন সবচেয়ে কম হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগের হার। জিডিপির অনুপাতে তা ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার হারও গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে শিক্ষিত তরুণেরা বেশি বেকার থাকছেন। বিবিএস এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এই সংখ্যা এখন প্রায় ৯ লাখ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক আছে। এ রিজার্ভকে ব্যবহার করে অর্থনীতির গতি যেমন বৃদ্ধি করা যায় তেমনি উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার না করে অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করলে সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভকে ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধির খাতে ব্যবহার করবে বলে আশা করি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।













