Kakistocracy শব্দটির আভিধানিক মর্মার্থ হল A state or society governed by its least competent, most ignorant, or corrupt leaders. অর্থাৎ একটি রাষ্ট্র বা সমাজ যখন তার কম যোগ্যতা সম্পন্ন, শিক্ষাগতভাবে চরম অদক্ষ এবং দুর্নীতি পরায়ণদের দ্বারা পরিচালিত হয় তখন ঐ রাষ্ট্র বা সমাজ Kakistocracy (কাকিসটোক্রেসি)র কবলে পড়ে শাসিত হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া যায়। ‘কাকিসটোক্রেসি’ শব্দটি গ্রীক। এ শব্দটির দুটি অংশ ‘কাকিসটোস’ অর্থ নিকৃষ্ট আর ক্রাটিয়া অর্থ শাসন/ক্ষমতা। ‘কাকিসটোক্রেসি’ শব্দটির আমরা সরল অর্থ করতে পারি, নিকৃষ্টের শাসন বলে। নিকৃষ্টের শাসনকে এক অর্থে প্রকাশের দারুণ ব্যাপারটি গ্রীকদের কাছ থেকে নিয়ে দুনিয়াব্যাপী পরিচয় এবং জনপ্রিয় করেন ইংরেজ লেখক টমাস লাভ পিকক তার ১৮২৯ সালে প্রকাশিত বই ‘দি মিস ফরচুন অব আলফিন’এর মাধ্যমে।
আমার গত দুটি লেখা যথাক্রমে ‘আমেরিকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ এবং ‘আনসার আল্লাহ হুতিদের অগ্রাভিযান -শংকায় বিশ্ব অর্থনীতি’তে আমি বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সাধারণ মানুষদের জন্য সৃষ্ট দুর্দশার বিষয়গুলি আলোচনা করতে গিয়ে আমার মাথায় আমেরিকার প্রশাসনের বর্তমান লেজেগোবরে অবস্থাদৃষ্টে ‘কাকিসটোক্রেসি’ শব্দটি ঘুরপাক খেতে থাকে। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি আমেরিকা, এটি অনস্বীকার্য। আর স্বভাবতই একটি পরাশক্তির আচরণ, গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্বের সকল প্রান্তে ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার শাসক শ্রেণি বিশেষ করে ক্ষমতার যিনি সর্বেসর্বা মালিক আমেরিকার প্রেসিডেন্টের গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহ থেকে প্রতীয়মান আমেরিকা ‘কাকিসটোক্রেসি’র কবলে। কেন এটি প্রতীয়মান তার উদাহরণ টেনে আমি পাঠকদের সামনে বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাই। জর্জ ডাব্লিউ বুশের শাসন আমলে ওয়াশিংটনের নিওকন এবং ডিভ স্টেটের ইসরাইলী লবি (এ বিষয়ে শিকাগো বিশ্ব-বিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক John Mearsheimer , (জন মারসিমার) এবং হার্ভাড কেনেডি স্কুলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক Stephen Walt , (স্টিফেন ওয়াল্ট) এর The Israel Lobby and U S Foregien Policy নামক গবেষণালব্ধ একটি বই রয়েছে। ইরাক আক্রমণ এবং ইরাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর ইরাকে তথাকথিত মানব বিধ্বংসী কোন অস্ত্র খুঁজে পেতে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা ব্যর্থ হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ইরান আক্রমণের তাদের প্রচেষ্ঠা প্রতিকূলতার মুখামুখি হয়। তদুপরি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক কর্মসূচী সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে ১৬ টি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে গঠিত ‘এন আই ই’ বা ‘ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্ট এস্টিমেট’ এর ইরানের উপর উপস্থাপিত সম্মিলিত এক প্রতিবেদন নিওকন এবং ডিভ স্টেটের ইসরাইলী লবিকে ইরান আক্রমণে আশাহত করে। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়-
এটি নিশ্চিত, ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। ২০০৭ সালে এসেও দেখা গেছে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনঃরাম্ভ করেনি। ইরানের কাছে কোন পারমাণবিক অস্ত্র নাই। এমতাবস্থায় ইরান চাইলেও তার বর্তমান সক্ষমতা এবং প্রকৌশলগত অবস্থান থেকে ২০১৫ সালের আগে তার পক্ষে কোন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী সম্ভব নয়।
‘ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্ট এস্টিমেট’ এর অভিমত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রভাব এবং চাপে ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী থেকে বিরত রয়েছে।
‘ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্ট এস্টিমেট’ তাদের প্রতিবেদনের উপসংহারে আসেন এইভাবে combination of threats of intensified international scrutiny and pressure along with opportunities for Iran to achieve its security, prestige and goals for regional influence in other way could encourage Iran to continue the halt in weapons development. মোদ্দা কথা ইরানকে আন্তর্জাতিক চাপ, কঠোর পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ করানোর পাশাপাশি তার নিরাপত্তা, সম্মান এবং কাংখিত আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জনে অন্যবিদ পন্থা অবলম্বনের পথ উন্মুক্ত রাখলে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচী স্থগিত রাখার বিষয়টি বজায় রাখতে পারে।
এ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নিওকনরা বিশেষ করে মাইকেল লেডেন, নরম্যান পডরেজের মত উগ্রপন্থিরা অবস্থান নেন। তারা ‘এন আই ই’ বা ‘ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্ট এস্টিমেট’ এর রিপোর্টকে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সামরিক এবং হোয়াইট হাউজের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা বাহিনীর ষড়যন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করে। তবে সে যাত্রায় পৃথিবী আরো একটি নির্মম নিষ্ঠুর যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়।
এর পরের অধ্যায় আরো দুর্ভাগ্যজনক আরো উপহাসমূলক।
সুদীর্ঘ আলাপ আলোচনার ফলশ্রুতি হিসাবে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’এর মাধ্যমে ইরান পশ্চিমাদের সাথে একটি রফায় পৌঁছেছিল। কিন্ত্তু ইসরাইল চায়নি ইরান স্বসম্মানে স্বগৌরবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক। এ কারণেই ক্যাপিটাল হিলের ইহুদি লবী পি-৫ + ১ অর্থাৎ জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য + জার্মানী কতৃক স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান থেকে আমেরিকাকে বেরিয়ে যেতে উস্কানি দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়।
জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’ এ যে সমস্ত ধারা ছিল তা পাঠকের জন্য তুলে ধরছি: ইরানের ইউরেনিয়াম মওজুদ ৯৮ পার্সেন্ট কমিয়ে ৩০০ কে জি তে নামিয়ে আনতে হবে এবং পরবর্তী ১৫ বছর এ অবস্থায় স্থিত রাখতে হবে। এই স্থিত মওজুদ ইউরেনিয়াম এর মান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর সমদ্ধৃকরণ মান ৯০ এ নেওয়া যাবে না এবং তা ৩.৬৭ এ স্থিত রাখতে হবে।
‘নাথানজ’ পারমাণবিক স্থাপনার ২০০০০ (বিশ হাজার) সেন্ট্রিফিউজ কমিয়ে, ৫০৬০ (পাঁচ হাজার ষাট) এ নামিয়ে আনতে হবে এটি ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে। ফ্রাডো পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রে ২০৩১ পর্যন্ত কোন প্রকার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ গবেষণা পরিচালনা করা যাবে না।
ইরান তার ‘আর্ক’ পারমাণবিক স্থাপনা রি ডিজাইন করতে সম্মত হয়। এই রি ডিজাইন’ এর ফলে এখানে কোন প্রকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী করা যায় সেরকম প্লুটুনিয়াম উৎপাদন ব্যবস্থা থাকবে না। ইরান পারমাণবিক জ্বালানী সমৃদ্ধকরণ উদ্দেশ্যে আর কোন স্থাপনা নির্মাণ করবে না।
ইরান, আই এ ই এ (ইন্টারন্যশনাল এ্টমিক এনার্জি এজেন্সি) কর্তৃক তার পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের ইচ্ছে পোষণ করলে ২৪ (চব্বিশ) দিনের মাথায় তা করতে দিতে সম্মত হয়।
জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান এর বলে ইরান তার অবরুদ্ধ ১০০ (একশত) বিলিয়ন ডলারের ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী রপ্তানী এবং গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ পাবে।
১৬ জানুয়ারি ২০১৬ আই এ ই এ (ইন্টারন্যশনাল এ্টমিক এনার্জি এজেন্সি) ইরান জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান এর সব ধারা পূরণ করেছে বলে নিশ্চিত করে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ চুক্তি অনুমোদন করে, ইতিপূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা ১৮ অক্টোবর ২০১৫ ‘জে সি পি ও এ’ তথা ‘জয়েন্ট কম্প্রেএনসিভ প্ল্যান অব এ্যাকশান’, এড্যাপশান ডে বা গ্রহণের দিন হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। আমেরিকার ইতিহাসের পাতায় সীমাহীন কলংক লেপন করে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘জে সি পি ও এ’ থেকে তার দেশকে প্রত্যাহার করে নেয়।
এর পর থেকে আজ এ অজুহাতে কাল সে অজুহাতে আমেরিকা, ইসরাইলের প্ররোচনায় ইরান আক্রমণের পথ খুঁজতে থাকে। এরই ফলশ্রুতি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকা ইসরাইল যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে বসে। আক্রমণের প্রথম আঘাত সহ্য করে ইরান প্রত্যাঘাত শুরু করে। এ আঘাতে মধ্যপ্রচ্যের তাবেদার রাষ্ট্রগুলির আমেরিকান ঘাঁটির অধিকাংশ লণ্ডভণ্ড হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ইরান এ যুদ্ধকে ক্রমাগত আঞ্চলিক এক যুদ্ধে রূপ দিতে সক্ষম হয়। ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ইরানী আক্রমণে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে আমেরিকার দেওয়া প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি অন্তসারশূন্য বলে প্রতীয়মান হয়। এখন আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার এতদিনের প্রভাব ক্রমশ হারাতে বসেছে।
সর্বশেষ ইয়েমেনের ইরানী প্রক্সি আনসার আল্লাহ হুতিরা তাদের অগ্রাভিযানে বাব আল মান্দেব উপকূলের প্রায় ৯০% তাদের দখলে নিয়ে লোহিত সাগর মুখি তেলবাহি/বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে প্রায়। এটি ইরানকে যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক দরকষাকষি দুটি ক্ষেত্রেই সুযোগ এনে দিয়েছে। এর মাঝে সৌদি আরবের ইস্ট ওয়েস্ট তেলবাহি পাইপ লাইন আক্রান্ত হলে সৌদি আরব তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বে জ্বালানী তেল সরবরাহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
এমন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশ সমূহের জ্বালানী তেলের উল্লম্ফন বৃদ্ধি/সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি, আমেরিকান সাধারণ মানুষও এ থেকে নিস্তার পাচ্ছে না, এসব থেকে প্রতীয়মান আমেরিকান প্রশাসন বিশ্বের মানুষের মঙ্গল থেকে অমঙ্গলই ডেকে আনছেন বেশি। এ থেকেই আমেরিকান প্রশাসনকে ঘিরে আমার মাথায় Kakistocracy (কাকিসটোক্রেসি) শব্দটি ঘুরপাক খাচ্ছে কেবলি!
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক,













