চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯০–৯২ শতাংশ আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়– অর্থাৎ এই একটি বন্দরের ওপরই নির্ভর করে জাতীয় অর্থনীতির শ্বাসপ্রশ্বাস। ২০২৫ সালে বন্দরটি হ্যান্ডলিং করেছে ৩৪ লাখ ১০ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার– নতুন রেকর্ড। অথচ লয়েডস লিস্টের ‘ওয়ান হান্ড্রেড পোর্টস ২০২৬’ প্রতিবেদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৬৮তম আগের বছরের চেয়ে এক ধাপ নিচে। রেকর্ড ভলিউম অর্জন করেও পিছিয়ে পড়ার এই বৈপরীত্য একটি কথাই বলে– প্রতিযোগীরা আমাদের চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।
সম্ভাবনা ও বাস্তবতা: চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান সত্যিকার অর্থেই এক আশীর্বাদ– দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও চীনের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই বন্দর পোশাক রপ্তানি খাতের প্রাণকেন্দ্র এবং মিরসরাই–মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল পরিচালিত পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল ইতিমধ্যে জাহাজের অপেক্ষার সময় প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে; ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গড় টার্নঅ্যারাউন্ড সময় দাঁড়িয়েছে ২.৫৮ দিনে, আগের বছর যা ছিল ২.৮১ দিন। প্রকৃত পরিবর্তন আসবে বে টার্মিনাল থেকে– বিশ্বব্যাংকের ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ও দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নির্মিতব্য এই টার্মিনাল ২০২৯–৩১ সালের মধ্যে চালু হলে একসঙ্গে ৩৫টি জাহাজ ভিড়তে পারবে এবং ১২ মিটার ড্রাফট সুবিধায় বড় মাদার ভেসেলও সরাসরি ভিড়তে পারবে।
তবে বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রাম মূলত একটি ‘ফিডার পোর্ট’– ট্রান্সশিপমেন্ট হাব নয়। এখানকার প্রায় সব কন্টেইনারই বাংলাদেশমুখী আমদানি বা রপ্তানি পণ্য, কলম্বো–সিঙ্গাপুরের মতো তৃতীয় দেশের স্থানান্তর কার্গো নয়। ৯.৫–১০.৫ মিটার ড্রাফট সীমাবদ্ধতা বড় জাহাজকে দূরে রাখে, কন্টেইনার ইয়ার্ড দখলের হার প্রায়ই ৮৮ শতাংশ ছোঁয়, আর পণ্য খালাসে সময় লাগে ১০–১৫ দিন পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংকের কন্টেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান নেমে এসেছে ৩৫৬ নম্বরে, আগের দুই বছরে যা ছিল ৩৩৭ ও ৩০৬।
প্রতিবেশীরা কতদূর এগিয়ে: শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর এই অঞ্চলের প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট হাব– ২০২৫ সালে হ্যান্ডলিং করেছে প্রায় ৮৩ লাখ টিইইউএস, লক্ষ্য এ বছরই ১ কোটি ছোঁয়া। এই বিশাল ভলিউমের বেশিরভাগই ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো– শ্রীলঙ্কার নিজস্ব বাণিজ্য নয়, বরং উন্নত সংযোগ ও দক্ষ পরিচালনার ফল। আরও চমকপ্রদ উদাহরণ ভারতের বিঝিনজাম বন্দর– আদানি পোর্টস ও এমএসসি–র যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বন্দরের প্রাকৃতিক ড্রাফট ২০–২৪ মিটার, চালুর মাত্র এক বছরেই বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের তালিকায় ৮৩তম স্থানে, হ্যান্ডলিং করেছে ১৫ লাখ ৭০ হাজার টিইইউএস, লক্ষ্য ২০২৮–২৯ সালের মধ্যে ৫০ লাখ টিইইউএস ছাড়িয়ে যাওয়া। তুলনাটা কঠোর শোনায়– চট্টগ্রামের ৩৪ লাখ টিইইউএস কলম্বোর অর্ধেকেরও কম, আর ভারতের একটিমাত্র নতুন টার্মিনালের লক্ষ্যমাত্রার একাংশ মাত্র। বাংলাদেশ শুধু সিঙ্গাপুরের চেয়েই পিছিয়ে নেই– দুই বছর আগে অস্তিত্বহীন এক বন্দরের চেয়েও পিছিয়ে পড়েছে।
সরকারের করণীয়: প্রথম কাজ– বন্দর পরিচালনাকে রাজনীতিমুক্ত করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দাঁড় করানো। কলম্বো–সিঙ্গাপুর–বিঝিনজাম যেভাবে ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট’ মডেলে চলে, চট্টগ্রামকেও সেদিকে এগোতে হবে– প্রতিবার আলাদা দর কষাকষির বদলে স্বচ্ছ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কাঠামোয়। বে টার্মিনাল নির্মাণ ও কর্ণফুলী চ্যানেল ড্রেজিং সমান্তরালে এগোতে হবে, কারণ গভীরতা ছাড়া সক্ষমতা যেমন অর্থহীন, সংযোগ সড়ক–রেল ছাড়া গভীরতাও অকেজো। Bangladesh Single Window-কে বাস্তবে কার্যকর করে কাস্টমস–বন্দর–শিপিং লাইনের ছাড়পত্র একই প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো– ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়ার অতিরঞ্জিত স্বপ্নের বদলে বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে দক্ষ ‘ডিরেক্ট–কল গেটওয়ে বন্দর’ হয়ে ওঠা, আর দূরবর্তী ট্রান্সশিপমেন্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা তোলা থাকুক ভবিষ্যতের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য। স্টোরেজ চার্জ ও শ্রম সম্পর্কে স্থিতিশীলতাও জরুরি– সামপ্রতিক বিরোধগুলো ঠিক সেই অনিশ্চয়তাই তৈরি করছে যা বিদেশি শিপিং লাইনকে দূরে ঠেলে দেয়।
স্বয়ংক্রিয়করণ ও ডিজিটালাইজেশন: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ এবং ২০২৪ সালের ‘স্বয়ংক্রিয়করণ উদ্যোগ’ শুভ সূচনা, কিন্তু খালাসে এখনো ১০–১৫ দিন লাগা প্রমাণ করে– ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক বিস্তর। প্রয়োজন গেট অটোমেশন (ওসিআর, স্বয়ংক্রিয় ওজন স্কেল), একটি প্রকৃত টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম যা বার্থ–ইয়ার্ড–ক্রেন পরিকল্পনা অ্যালগরিদমে করে, এবং এআই–চালিত ভেসেল–ট্রাফিক শিডিউলিং– যেমনটি সিঙ্গাপুর ও রটারডাম ২০২৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে করছে, যা চট্টগ্রামের সংকীর্ণ কর্ণফুলী চ্যানেলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ভারতের ভিওসি বন্দরে বসানো ডিজিটাল টুইনের মতো প্রযুক্তি জট তৈরি হওয়ার আগেই তা চিহ্নিত করতে পারে। সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে বে টার্মিনালেই– নতুন টার্মিনালে শুরু থেকেই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি বসানো পুরনো টার্মিনালে পরে সংযোজনের চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী। আইএমও–র হিসাবে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা প্রযুক্তি বন্দরে পণ্য আটকে থাকার সময় প্রায় ২৫ শতাংশ কমাতে পারে– তবে শর্ত একটাই, বিচ্ছিন্ন পাইলট নয়, প্রান্ত থেকে প্রান্ত সংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে।
উপসংহার: চট্টগ্রামকে ‘পরবর্তী সিঙ্গাপুর’ বানানোর বড় স্বপ্ন না দেখলেও চলবে। বরং প্রয়োজন, বাংলাদেশের অন্যথায় প্রতিযোগিতাক্ষম রপ্তানি অর্থনীতির সবচেয়ে ধীর ও ব্যয়বহুল সংযোগ হয়ে থাকা বন্ধ করা। প্রতিটি বিলম্বিত জাহাজে রপ্তানিকারকদের দৈনিক ক্ষতি ১০–১৫ হাজার ডলার, জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক অপচয় ২০০–৩০০ মিলিয়ন ডলার। সমাধানের বেশিরভাগ ইতিমধ্যে অর্থায়িত ও কাগজে–কলমে চলমান– যা অনুপস্থিত তা কেবল বাস্তবায়নের গতি আর রাজনীতিমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি। বে টার্মিনাল, পতেঙ্গার অর্জিত গতি ও সংযোগ অবকাঠামো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে আগামী এক দশকে চট্টগ্রাম কলম্বোর সঙ্গে ব্যবধান অনেকখানি কমাতে পারবে। চট্টগ্রামের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য বন্দর হয়ে ওঠা– আর সেই যাত্রায় দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সমন্বিত পরিকল্পনাই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পথ।
লেখক: ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আরিয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, চট্টগ্রাম সমিতি–ঢাকা।












