চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা তৃতীয় দিনেও কাটেনি। অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে একই দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, গণস্বাক্ষর ও মশাল মিছিলের মধ্য দিয়ে দিনভর ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ অব্যাহত ছিল।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবি:
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে এতে অংশ নেন। মানববন্ধনে তারা নবনিযুক্ত উপাচার্যের নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং অধ্যাপক ড. সায়েমকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। ‘সায়েম স্যারকে ভিসি চাই’ সহ বিভিন্ন স্লোগানে তারা তাদের দাবি তুলে ধরেন। মানববন্ধনে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তফা খালিদ বিন শামস আরিয়ান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠিও পাঠ করেন। একই সঙ্গে আগের দিন শুরু হওয়া গণস্বাক্ষর কর্মসূচি বৃহস্পতিবারও অব্যাহত থাকে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
শিক্ষক সমিতির সংবাদ সম্মেলন, নতুন ভিসিকে নিয়ে আপত্তি:
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির পাশাপাশি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন করেছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। পরে বিকেল ৩টায় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অধ্যাপক ড. সায়েম তাঁর নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চলমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন বলেও জানানো হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরতে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও বিষয়টি তুলে ধরার কথা জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি। আগামী রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ধর্মঘট ও কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসানুল্লাহ নতুন উপাচার্য প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা নতুন ভিসিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাই না।”
মশাল মিছিলে উত্তাল ক্যাম্পাস:
দিনের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মশাল মিছিল করেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে মশাল হাতে মিছিল বের হয়ে স্বাধীনতা চত্বরে এসে মিলিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং অধ্যাপক ড. সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে সম্মিলিত মিছিলটি স্বাধীনতা চত্বর থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যানবাহন শাখা প্রদক্ষিণ করে আবার স্বাধীনতা চত্বরে এসে শেষ হয়। মিছিল শেষে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে মোমবাতি প্রজ্বালন করেন শিক্ষার্থীরা। মোমবাতি দিয়ে সেখানে ‘৫৬’ সংখ্যা ফুটিয়ে তোলা হয়। এ সময় আন্দোলনকারীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মশাল মিছিল শেষে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ র্যালি এবং বিকেলে গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি পালন করবেন শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পর ওই রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি। এর ফলে ক্লাস-পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো শাটডাউনের পাশাপাশি গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান জানান। বর্তমানে অধ্যাপক ড. সায়েমের পুনর্বহালের দাবিকে কেন্দ্র করে একাধিক কর্মসূচি চলমান রয়েছে এবং আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।













