রাজকীয় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন বাদশাহ আবদুল আজিজ। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ ‘সউদ’–এর নামানুসারে এই বিশাল দেশের নামকরণ করেন ‘সৌদি আরব’। একই সাথে তিনি দেশে রাজতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং নিজেকে জাতির পিতা ও এই বিশাল দেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ঘোষণা দেন। সে সময় অথবা তার কিছুদিন পর তিনি একটি উইল (ইচ্ছাপত্র) লিখে যান, যেখানে তাঁর মৃত্যুর পর কে কীভাবে বাদশাহ হবেন।
মূলত ১৭৪৪ সালে সউদ নজদের দিরিয়া বা দরিয়া অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধারণা করা হয়, হেজাজে তুর্কি সুলতানদের শাসন অনুকরণে এই ছোট রাষ্ট্রটি গঠন করে। ১৫১৭ সালে মিশরের পর হেজাজ অঞ্চলও তুর্কি সুলতান প্রথম সেলিমের নিয়ন্ত্রণে আসে। তখন হেজাজের দায়িত্বে ছিলেন শরীফ বারাকাত। সুলতান সেলিম শামের (সিরিয়া) উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর হেজাজের দিকে দৃষ্টি দেন এবং শরীফ বারাকাতের কাছে আনুগত্য দাবি করেন। শরীফ বারাকাত বাধ্য হয়ে আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর পুত্র মুহাম্মদকে ইস্তাম্বুলে পাঠান। মাঝখানে কিছু সময় প্রতিকূলতা থাকলেও তুর্কি সুলতানরা দীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছর পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনাসহ হেজাজ শাসন করেন।
অন্যদিকে নজদে সউদের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মুহাম্মদ উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা লাভ করেন। তিনি নজদের ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নজদীর মেয়েকে বিয়ে করেন। এর ফলে বাদশাহ যেমন ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমর্থন পান, তেমনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নজদীও তাঁর মতাদর্শ প্রচারে রাষ্ট্রীয় সমর্থন লাভ করেন। এভাবে তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠেন। কিছুদিনের মধ্যেই নজদের রাজধানী দিরিয়া বা দরিয়া থেকে রিয়াদে স্থানান্তরিত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে হেজাজের গভর্নরের অযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে সউদ গোষ্ঠী হেজাজ দখল করে নেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ মিশরের গভর্নরের মাধ্যমে এক বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে অভিযান চালান। তুর্কি বাহিনী হেজাজ মুক্ত করে নজদের দিকে অগ্রসর হয় এবং নজদও দখল করে নেয়। ফলে সউদ গোষ্ঠী প্রথমে কাতার এবং পরে কুয়েতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
কুয়েতেই বাদশাহ আবদুল আজিজ বেড়ে ওঠেন। এই সাহসী যুবক ১৯০২ সালে মতান্তরে মাত্র ৪০ জন যোদ্ধা নিয়ে রিয়াদের দুর্গ আক্রমণ করেন। রিয়াদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে তাঁর প্রায় ৫ বছর সময় লেগেছিল।
বিচক্ষণ, সাহসী ও দূরদর্শী বাদশাহ আবদুল আজিজ রিয়াদে নিজের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার পর আশেপাশের ছোট ছোট অঞ্চলগুলো জয় করতে শুরু করেন। এই সময়ে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বাদশাহ ফয়সালের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ফয়সাল খুব অল্প বয়স থেকেই পিতার ডান হাত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন।
ঐদিকে তুর্কি সুলতানরা যখন চরম প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি, তখন তুরস্কের গভর্নর শরীফ হোসাইন তুর্কি সৈন্যদের হটিয়ে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। এই কাজে তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থন পান। স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরই শরীফ হোসাইন নিজেকে ‘আমিরুল মোমেনীন‘ হিসেবে ঘোষণা করেন।
তবে শরীফ হোসাইনের মাত্র ১০–১২ বছরের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে এবং দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। হেজাজে চুরি, ডাকাতি ও রাহাজানি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন হজযাত্রীদের বর্ণনা থেকে এই অব্যবস্থাপনার চিত্র পাওয়া যায়। যেমন–১৯১২ সালে মগনামার জমিদার ওয়ায়েজ উদ্দিন মহুরী, ১৯১৪ সালে হাটহাজারীর কাটির হাটের মাওলানা ইয়ার মুহাম্মদ, ১৯২০ সালে সাতক্ষীরা নলতা দরবারের পীর খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ হজ পালন শেষে তাঁদের ভ্রমণকাহিনিতে শরীফ হোসাইনের আমলের এই চরম অরাজকতার কথা তুলে ধরেন।
হেজাজে যখন এমন চরম অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা চলছিল, তখন বাদশাহ ফয়সাল তায়েফ থেকে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে এসে পবিত্র মক্কা নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর জেদ্দা এবং সবশেষে পবিত্র মদিনা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আসে। শরীফ হোসাইন তাঁর পরিবার ও ধনসম্পদ নিয়ে ব্রিটিশদের সহায়তায় জেদ্দা হয়ে সমুদ্রপথে ফিলিস্তিনে পালিয়ে যান।
বাদশাহ আবদুল আজিজের নেতৃত্বে হেজাজে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। চুরি–ডাকাতি বন্ধ হয়ে দেশে শান্তি–শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এরপর আরও কয়েক বছর ধরে তিনি তাঁর অধিকৃত সাম্রাজ্যকে গুছিয়ে নেন। অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ‘সৌদি আরব‘ নাম দিয়ে রাজতন্ত্র ঘোষণা করেন।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বাদশাহ আবদুল আজিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলেও, তখনো অর্থনৈতিক সংকট কাটেনি। ১৯৩৫ সালে খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী মুম্বাই থেকে ‘আমিরুল হজ‘ হিসেবে হজে গিয়ে পবিত্র মক্কায় বাদশাহ আবদুল আজিজের সাথে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেন। তাঁর বর্ণনাতেও তৎকালীন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হজের অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠে।
পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে আকাশপথের যোগাযোগ চালু হয়। ১৯৪০ সালের পর জেদ্দা ও রিয়াদে বিমানবন্দর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৫০ সালে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় বিমানবন্দর চালু হয়। তা সত্ত্বেও দেশের আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটছিল না।
১৯৭৩ সালে ইসরায়েল–মিশর ১৭ দিনের যুদ্ধ এবং তাতে আমেরিকার হস্তক্ষেপের কারণে মুসলিম বিশ্বের তৎকালীন নেতা বাদশাহ ফয়সাল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি তেল অবরোধের ঘোষণা দেন। সেই সময় তেল উৎপাদনকারী দেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বাদশাহ ফয়সালের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের তীব্র হাহাকার তৈরি হয়। পরবর্তীতে তেলের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে বিক্রি শুরু করলে সৌদি আরবের অর্থনীতি অভাবনীয়ভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
এর আগে, ১৯৫৩ সালের ৯ নভেম্বর বাদশাহ আবদুল আজিজ ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম পুত্র সউদ বাদশাহ হন। কিন্তু সউদের অযোগ্যতার কারণে ১৯৬৪ সালে ফয়সাল যুবরাজ থেকে বাদশাহর দায়িত্ব নেন।
১৯৭৫ সালে রিয়াদের রাজপ্রাসাদে বাদশাহ ফয়সাল তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্রের হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর খালেদ তৃতীয় বাদশাহ হিসেবে ক্ষমতা লাভ করেন। ১৯৮২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাদশাহ খালেদ মারা গেলে যুবরাজ ফাহাদ ৪র্থ বাদশাহ হন।
বাদশাহ ফাহাদের আমলকে হজ ও ওমরাহযাত্রীদের কল্যাণে ‘স্বর্ণযুগ‘ বলা হয়। মসজিদে নববীকে প্রায় ৮–১০ গুণ বড় ও দৃষ্টিনন্দন করে সম্প্রসারণ এবং পবিত্র মদিনা শহরকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বাদশাহ ফাহাদের অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন ‘সোদাইরী সেভেন‘ (সোদাইরী বংশের প্রভাবশালী কন্যা হাসসা ও বাদশাহ আবদুল আজিজের ঘরের ৭ পুত্র)-এর প্রথম সন্তান। ফাহাদ বাদশাহ হওয়ার পর আবদুল্লাহ যুবরাজ হন। বাদশাহ ফাহাদ জীবনের শেষভাগে দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকায় যুবরাজ আবদুল্লাহ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালন করেন। বাদশাহ আবদুল্লাহ ছিলেন নজদের রশীদি বংশের আবদুল আজিজের স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান। ২০০৫ সালের ১ আগস্ট বাদশাহ ফাহাদ মারা গেলে আবদুল্লাহ পূর্ণাঙ্গ বাদশাহ হন।
বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলে ‘সোদাইরী সেভেন‘-এর অপর দুই ভাই (বাদশাহ ফাহাদের ছোট ভাই) নায়েফ ও সুলতান যুবরাজ থাকা অবস্থাতেই পরপর মারা যান। এরপর ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি বাদশাহ আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করলে ‘সোদাইরী সেভেন‘-এর কনিষ্ঠ সন্তান ও বাদশাহ ফাহাদের সহোদর ভাই সালমান সৌদি আরবের পূর্ণাঙ্গ বাদশাহ হন।
বর্তমানে বিভিন্ন বাস্তবতার নিরিখে বাদশাহ সালমানের পুত্র মুহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাদশাহ সালমান অসুস্থ থাকায় মূলত যুবরাজ মুহাম্মদই তাঁর দাদা বাদশাহ আবদুল আজিজের প্রতিষ্ঠিত এই বিশাল সৌদি আরবের শাসনকার্য পরিচালনা করে যাচ্ছেন বলা যাবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট













