মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গবেষণার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন

চমেকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সেমিনারে মেয়র

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

মশক নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পেরেশনের চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভে, ডেটা বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এসময় গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোথায়, কখন এবং কী ধরনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন এ সেমিনার আয়োজন করে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনিসুল হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ এন এম মনোয়ারুল কাদির (বিটু)। ডা. শাহাদাত বলেন, বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের ধরন, বিস্তৃতি ও তীব্রতায় পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু, নগরায়ণ, মানুষের চলাচল, মশার প্রজনন পরিবেশ এবং ভাইরাসের বিভিন্ন সেরোটাইপের পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো রোগের গতিপ্রকৃতিতে প্রভাব ফেলছে। ফলে মশাবাহিত রোগ, বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাড়িঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে হবে। একই সঙ্গে রোগী শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়র বলেন, ডেঙ্গুকে শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখলে হবে না। প্রতিবছর এর ধরন ও বিস্তৃতিতে পরিবর্তন আসছে। কোন এলাকায় কখন সংক্রমণ বাড়ছে, কোন ধরনের মশা বেশি সক্রিয়, কোন সেরোটাইপ বেশি বিস্তার লাভ করছে, জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সংক্রমণের কী সম্পর্ক এবং কোন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বেশি কার্যকরএসব বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতেও বছরের পর বছর উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। চট্টগ্রাম জেলায় ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে ৪১ জন, ২০২৩ সালে ১০৭ জন, ২০২৪ সালে ৪৫ জন, ২০২৫ সালে ২৭ জন এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি এলাকায় ৭ জন মারা গেলেও জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। আগস্টে ১ জন মারা গেছেন এবং সেপ্টেম্বরে ৬ জন মারা গেছেন । বিভিন্ন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আগস্ট থেকে নভেম্বরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বেশি। তবে পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে ৯ জন মারা গেছেন এবং অন্য জেলার একজন রোগী শহরে এসে মারা গেছেন। অর্থ্যাৎ, শহরের চেয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে মৃত্যুহার বেশি।

মেয়র বলেন, এ থেকে বুঝা যায় একটি বছরে মৃত্যু কমেছে বলেই আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারি না। আবার কোনো বছরে মৃত্যু বেড়ে গেলে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম বাড়ালেই হবে না। কেন সংক্রমণ বাড়ছে এবং কোন পদ্ধতিতে তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবএ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ এন এম মনোয়ারুল কাদির (বিটু) বলেন, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে একযোগে কাজ করছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা হতে পারে বড় হাতিয়ার। আশা করছি ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা সফল হব।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসক, গবেষক, নগর কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, এডিস মশার ঘনত্ব নির্ণয়, কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রতিরোধক্ষমতা, জলবায়ুর প্রভাব এবং রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাপ্রতিটি ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ তথ্যকে কাজে লাগাতে হবে।

সেমিনারে অংশ নেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন, বিভাগীয় পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সাজিদুর রহমান, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. তমিজউদ্দিন আহমেদ মানিক, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার, অধ্যাপক ডা. হাবিব হাসান, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী, ডা. ইফতেখার উদ্দিন লিটন, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল করিম চৌধুরী, ডা. এস এম সারওয়ার আলম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৃষ্টির আলোয় বদলে যাচ্ছে জীবন, পাশে আধুনিক প্রযুক্তি
পরবর্তী নিবন্ধআমাদের এদেশ থেকে পালানোর রেকর্ড নাই