
ঝরনা প্রকৃতির এক অনন্য, মনোমুগ্ধকর ও বিস্ময়কর সৃষ্টি। পাহাড়ের বুক চিরে চঞ্চল ধারায় পাথুরে বাঁধা অতিক্রম করে স্বচ্ছ স্রোতধারা তীব্র বেগে নিচের দিকে ছুটে আসে। সেখান থেকেই প্রকৃতিতে জীবন্ত সুর ও ছন্দের মেলবন্ধন হয়। কবি এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাজারো উপমায় অপরূপ সৌন্দর্যকে বন্ধনা করেন। ঝরনার সৌন্দর্য মানুষের অশান্ত মনকে এক পুষ্পিত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এটি মানব জীবনের এগিয়ে চলার সৌন্দর্য ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। ঝরনা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়। এটি প্রকৃতিতে জীববৈচিত্র্যের ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি পরম করুণাময়ের এক অপার মহিমা।
সীতাকুণ্ড বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার একটি পাহাড়ি ও উপকূলীয় উপজেলা। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২০–৩৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানকার পাহাড়ি রেঞ্চ ও বনাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলি দৃষ্টিনন্দন, রূপবতী ও মায়াবতী ঝরনা। সীতাকুণ্ডকে তাই অনেকেই ঝরনার রাজ্য বলে থাকে।
সীতাকুণ্ডের নয়নাভিরাম ঝরনাসমূহ–
সহস্রধারা ঝরনা–সহস্রধারা ঝরনা চন্দ্রনাথ রিজার্ভ
ফরেস্ট ব্লকের চিরসবুজ বনাঞ্চল সমৃদ্ধ সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে অবস্থিত। এই ঝরনাটি প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি। এটির দুটি ধারা রয়েছে। যথা—
১) সহস্রধারা–১ ঝরনা: এই ঝরনাটি সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে অবস্থিত। এটি উঁচু পাহাড় এবং সবুজ প্রকৃতির কোলে তার সৌন্দর্য নিয়ে বয়ে চলেছে। এই ঝরনাতে বর্ষাকাল ছাড়া অন্যান্য ঋতুতে পানি কম থাকে। কিন্তু বর্ষায় পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। ইকোপার্কের মূল গেইট থেকে ইট বিছানো পথ ধরে পাঁচ কিলোমিটার গেলেই এর দর্শন পাওয়া যায়।
২) সহস্রধারা–২ ঝরনা: এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট দারোগাহাট বাজারের কাছে সহস্রধারা সেচ প্রকল্পের অভ্যন্তরে অবস্থিত। এটিও সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের ভিতরে বয়ে চলেছে। সহস্রধারা–১ ঝরনা থেকে এটি আলাদা এবং স্থানীয়ভাবে মূল সহস্রধারা বলতে দ্বিতীয় ঝরনাটিকে বোঝানো হয়।এটি বর্ষাকালে পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণবন্ত হয়। এই ঝরনাকে সহস্রধারা নামে অভিহিত করা হয়। কারণ বর্ষাঋতুতে ভরা বর্ষায় এই ঝরনাটি পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। তখন বিশাল পাহাড়ের পাথুরে দেওয়াল বা বুক চিরে অসংখ্য পানির ধারা শত সহস্র ধারায় বা ক্ষুদ্র কণায় ছড়িয়ে একসঙ্গে নিচে নেমে আসে। এই দৃশ্য এবং পানির বহুপ্রসারী ও বহুমুখী ধারার সেই রূপকে ‘সহস্রধারা’ নামে অভিহিত করা হয়। এককথায় বলতে গেলে সহস্রধারা বা অজস্রধারার সমাহার।
এই নামকরণের ধর্মীয় বা পৌরাণিক কাহিনিও লোকমুখে বর্ণিত আছে। হিন্দুপুরাণ ও সনাতন ধর্মে মহাদেব বা শিবের মাথায় গঙ্গার ধারণ এবং সহস্রধারায় গঙ্গা নদীর মর্ত্যে আগমনের ধর্মীয় মাহাত্ম্য রয়েছে।
সুপ্তধারা ঝরনা: সুপ্তধারা একটি নয়নাভিরাম ঝরনা। সীতাকুণ্ড উপজেলার চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেস্ট ব্লকের চিরসবজ বনাঞ্চল সমৃদ্ধ সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে সুপ্তধারা ঝরনাটি অবস্থিত। এটি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ছোট বড় পাহাড়ি ঢাল ও ছড়া বেয়ে নেমে এসেছে। এটির নামকরণেও রয়েছে চমকপ্রদ তথ্য। বছরের বেশিরভাগ সময় এতে পানি খুব কম থাকে, প্রায় থাকে না বললেই চলে। শুধু বর্ষাকালে এটি পূর্ণতা বা যৌবনপ্রাপ্ত হয়। আর এই কারণেই স্থানীয়ভাবে এটিকে ‘ঘুমন্ত ঝরনা’ বা ‘সুপ্তধারা’ বলা হয়।
ঝরঝরি ঝরনা: সীতাকুণ্ড উপজেলার পান্থছিলা এলাকায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ের কাছাকাছি একটি গভীর ঝিরিপথ বা ট্রেইলের ভিতর ঝরঝরি ঝরনা অবস্থিত। এটি একটি সুন্দর প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। পন্থিছিলা বাজার হতে ঝরনা অব্দি হেঁটে যেতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে। এটি আকারে তেমন বড় নয়। কিন্তু এর পরিবেশ ও সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। এই ঝরনার বিশেষ আকর্ষণ হলো প্রাকৃতিক উপায়ে সিঁড়ির মতো খাঁজকাটা ক্যাসপেড যা পর্যটকদের কাছে ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ বা ‘স্বপ্নের সিঁড়ি’‘ বা ‘প্রাকৃতিক সিঁড়ি’ নামে পরিচিত। এটি ‘জোরজোরি’ বা ‘ঝরঝরিয়া’ ঝরনা নামেও পরিচিত। এই ঝরনাটির এমন ছান্দিক নামকরণের কারণ হলো এই ঝরনার পানি উঁচু পাহাড় থেকে পাথুরে ধাপে অবিরাম ঝরঝর শব্দে ঝরে পড়ে। স্থানীয়ভাবে এই একটানা অবিরাম ঝরঝর পতনের ধ্বনি থেকেই এমন কাব্যিক নামকরণ ‘ঝরঝরি’। এই ঝরনার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো কেবল একটি মূল ঝরনা নয় বরং মূল ঝরনায় পৌঁছানোর ট্রেইলজুড়ে ছোট– বড় অসংখ্য চোখ জুড়ানো উপ ঝরনা বা ক্যাসপেড ও ঝিরিপথ রয়েছে। যা সাধারণ পর্যটকদের কাছে ‘গুপ্ত ঝরনা’ নামে পরিচিত। আর এই পথ দিয়ে হাঁটার সময় সমস্ত পথেই পানি পড়ার মিষ্টি ও একটানা ঝরঝর শব্দ এক শান্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে।
মূর্তিঝরনা: সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা এলাকায় অবস্থিত বিখ্যাত ঝরঝরি ট্রেইলের একটি আকর্ষণীয় ঝিরিপথ ও জলপ্রপাত হলো মূর্তি ঝরনা। ঝরঝরি ট্রেইলের কানিছড়া ঝিরি ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় ঝিরির মধ্যে মানুষের মুখের আকৃতি একটি পাথরের দেখা মেলে। এই পাথরের গঠন আকৃতির কারণে স্থানীয় অনেকে একে মূর্তি ঝরনা বলে ডাকেন। প্রকৃতি প্রেমিকরা একে ‘মূর্তি ঝড়া’ নামেও ডাকেন। বর্ষাকালে মূর্তি ঝরনা পূর্ণরূপে আবির্ভূত হয়। উপর থেকে বিপুল পরিমাণ পানি প্রচণ্ড শব্দে নিচে আছড়ে পড়ে। এই ঝরনার প্রধান আকর্ষণ হলো পানির পতনের ঠিক নিচে অবস্থান করে বিশাল পাথরটি। পানি যখন উপর থেকে আছড়ে পড়ে তখন পাথরটি পানির ঝাপসায় রহস্যময় মূর্তির রূপ নেয়। মূর্তি ঝরনা যাওয়ার পথটি বেশ ছায়াবৃত ও নির্জন। খাড়া পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সূর্যের আলো সব সময় সরাসরি পৌঁছায় না। যা ট্রেইলে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে।
বাড়বকুণ্ড ঝরনা: সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের পূর্বদিকে পাহাড় ঘেরা একটু প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। এটি মূলত বাড়বকুণ্ড অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি অবস্থিত। এটি এক মনোরম ও আকর্ষণীয় ঝরনা। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো পাহাড়ের সবুজ বনভূমির বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা, পাথুরে পথ আর চারপাশে নীরব নির্জন পরিবেশ। পাহাড়ি ঝিরিপথ, সবুজ গাছপালা এবং পেয়ারার বাগান পেরিয়ে এই বাড়বকুণ্ড ট্রেইলে যেতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কম থাকলেও বর্ষাঋতুতে এর সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। তখন প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতায় পানির ধারা পাথরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে। সবুজ পাহাড়, ঝরনার কলধ্বনি আর নির্মল প্রকৃতির মেলবন্ধনে বাড়বকুণ্ড ঝরনা চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ নিদর্শন।
গরম পানির ঝরনা: সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড পাহাড়ি এলাকায় গরম পানির ঝরনা অবস্থিত। এটি সীতাকুণ্ডের অন্যতম একটি রহস্যময় ও দর্শনীয় স্থান। বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে পূর্বদিকের রাস্তা ধরে প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটলে ঐতিহাসিক কালভৈরবী মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। মন্দির পার হয়ে পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরিপথ ধরে সামনে এগোলেই এই গরম পানির ঝরনার দেখা মেলে। এই ঝরনার বিশেষত্ব হলো এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ বা গরম পানির ঝরনা হিসেবে পরিচিত। এই ঝরনার বিস্ময় হলো এর পাদদেশে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যের কারণে এটি ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কূপে গ্যাস ও আগুনের আঁচের কারণে ঝরনার পানি সবসময় গরম থাকে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো এখানে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক মিথেন গ্যাসের উপস্থিতির কারণে বছরের পর বছর ধরে পানির উপরিভাগে অনবরত বুদবুদ ও আগুন প্রজ্বলন। এটি একটি বিরল ঘটনা। হিন্দুধর্মাবল্বীরা বিশ্বাস করেন, এটি কোন সাধারণ ঘটনা না বরং এটি একটি দিব্য আশীর্বাদ বা অলৌকিক নিদর্শন। এই অনির্বান অগ্নিশিখা দৈবশক্তি ও অগ্নি দেবতার উপস্থিতির প্রতীক এবং কুণ্ডের জল পবিত্রতার প্রতীক। তাদের বিশ্বাস এই পবিত্র কুণ্ডের পানিতে স্নান বা তর্পণ করলে বা পবিত্র জলে ডুব দিলে মানুষের সমস্ত পাপ মোচন হয় এবং পুণ্য লাভ হয়।
বাঁশবাড়িয়া ঝরনা: সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্ব দিকে পাহাড়ে এই ঝরনা অবস্থিত। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত এবং পূর্ব পাশে এই ঝরনা। একে বিলাসী ঝরনাও বলা হয়।
মধুখাইয়া ঝরনা: এটিও সীতাকুণ্ডের আরেকটি আকর্ষণীয় ঝরনা। সীতাকুণ্ড উপজেলার বারৈয়ারঢালা ইউনিয়ন এলাকায় একটি তুলনামূলক নির্জন ও কম পরিচিত পাহাড়ি ট্রেইল। এই ট্রেইলের মধ্যেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত মধুখাইয়া ঝরনা। এই ঝরনায় যেতে হলে গিরিপথ, নুড়ি– পাথর ও বনভূমির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় হাঁটতে হয়। ঝরনাটির উচ্চতা আনুমানিক ৩০ ফুট। বর্ষাকালে এই ঝরনা পানিতে পূর্ণ রূপবতী হয়ে ওঠে এবং ঝরনার প্রবাহও বেড়ে যায়। চারপাশের গভীর সবুজ বন, পাখির ডাক, ঝিরির স্বচ্ছ পানি এবং পাহাড়ি নীরবতা মিলে জায়গাটি আকর্ষণীয়। সীতাকুণ্ডের ঝরনাগুলি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অমূল্য সম্পদ। প্রকৃতির এই মহান আশীর্বাদ সীতাকুণ্ডের পর্যটন শিল্পের প্রাণশক্তি। এই ঝরনাগুলির সৌন্দর্য একদিকে আমাদেরকে বিস্মিত করে অপরদিকে মনের ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তিতে ভরে দেয়। ভূ–তাত্ত্বিক গুরুত্বের দিকেও প্রকৃতির এই সম্পদ গুরুত্ব বহন করে। তাই এদের রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ঝরনার চিরন্তন সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে হবে।এই ঝরনাগুলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল রাজস্ব আয়েরও সুযোগ রয়েছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক; বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, নিজামপুর সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।













