
ভূমিকা:
শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে পঠন–পাঠনকালে বিভিন্ন টেক্সটবুক ও জার্নালে প্রাপ্ত ‘স্কুল–স্বাস্থ্য’ অধ্যায়টা আমাকে সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করতো। শিশুর স্বাস্থ্য–সুরক্ষায় ‘বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার’ গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তাই কীভাবে তা রুপায়ন করা যায়–সেই চিন্তা মনে জায়গা করে নেয়।
সৌভাগ্যক্রমে আমার ‘স্কুল–স্বাস্থ্য’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেখানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্কুলগুলোতে পড়ুয়াদের জন্য ‘বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচী’ গ্রহণে অণুপ্রাণিত করেন। যে কারণে তাঁর দিক্নির্দেশনা মতো আমি ‘স্কুল শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য কার্ড’ প্রণয়নে হাত দেই। বলতে দ্বিধা নেই, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, এবং শিক্ষা কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষিকা বৃন্দ এই উদ্যোগে অভূতপূর্ব সাড়া দেন।
স্কুল স্বাস্থ্য :
একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের পরবর্তী জীবন বহুলাংশ নির্ভর করে স্কুলবয়সের সুস্বাস্থ্যের ওপর। এ বয়সে সামান্য বিপত্তি যেমন–পরিবেশগত দূষণ, সুষম খাদ্যপুষ্টির অভাব, সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণজনিত ক্ষত দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রয়োজন–বিদ্যালয়ে ‘স্বাস্থ্যকর স্কুল’ পরিবেশ, যেমন–পরিশ্রুত পানীয় জল, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ খেলার মাঠ, পরিচ্ছন্ন টিফিন রুম প্রভৃতির বন্দোবস্ত ।
স্কুল হেলথ টিম: বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য–সেবা কর্মসূচি পালনে প্রাথমিক কাজ হলো প্রধান শিক্ষকের সাথে ২–৩ জন শিক্ষক (কমপক্ষে ১ জন পুরুষ এবং ১ জন মহিলা, বিশেষত যাঁদের স্বাস্থ্য–বিজ্ঞানের পটভূমি জীববিজ্ঞান / হাইজিন বিষয়ে পড়াশোনা আছে) ও সমন্বয়কারী হিসাবে কয়েকজন স্কুল শিক্ষার্থী, যাদের বেশিরভাগই সিনিয়র ক্লাসের নিয়ে ‘স্কুল হেলথ টিম’ গঠন ।
স্কুল ক্লিনিক: স্কুল ক্লিনিক অধ্যয়নরত শিশুর শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনে ল্যাব–টেস্ট করিয়ে সময়মতো চিকিৎসা–ব্যবস্থাপনা দিতে পারে। বিদ্যালয়ে শিশু হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে, বমি, ডায়রিয়া, খিঁচুনি বা দুর্ঘটনার শিকার হলে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ ও ওষুধের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্জনীয়।
স্কুল নার্স: অনেক স্কুলে নিয়মিতভাবে বা পার্ট–টাইম হিসাবে সিনিয়র অভিজ্ঞ স্কুল–নার্স ও স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। স্কুল নার্সের দায়িত্ব সমূহের মধ্যে রয়েছে–প্রতিটা শিশুর স্বাস্থ্যগত ইতিহাস নেওয়া, শিশুর পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর খাবার–দাবার, ত্বক, হাত–পা, চুল, দাঁত, মুখ প্রভৃতি যত্ন নেওয়া বিষয়ে পরামর্শ দান প্রভৃতি। তিনি স্কুল হাইজিন ও পরিবেশ নিয়মিত তদারকি করে স্কুল নার্স ডেঙ্গু মহামারির মতো রোগ বিস্তার রোধে ভূমিকা রাখতে পারেন।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রবর্তিত ‘স্কুল হেলথ প্রোগাম’ এর আওতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত প্রতিটা স্কুলে গঠিত হয়েছে ‘স্কুল হেলথ টিম’ ও ‘স্কুল ক্লিনিক’। স্কুলসমূহে প্রতিজন শিক্ষার্থীকে প্রদান করা হয়েছে ‘স্কুল শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য কার্ড ’। যেখানে স্কুল পড়ুয়াদের পরিচয়: নাম, জন্ম তারিখ, আইডি নাম্বার, বিদ্যালয়ের নাম, শ্রেণি, মাতা–পিতার নাম ও ঠিকানা, রক্তের গ্রুপ, স্বাস্থ্যকর স্কুল পরিবেশ: বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ খেলার মাঠ, পরিচ্ছন্ন টিফিন রুম, ও স্কুল মিল, স্বাস্থ্য পরীক্ষা: ১৪ টা ভিজিট–প্রতি ভিজিটে ওজন, উচ্চতা, মাথার আকার, শিশুর বিকাশ, অসুবিধাসমূহ, বিশেষ নিদেশর্না ইত্যাদি, এবং টিকাদান রেকর্ড: ইপিআই ও অন্যান্য টিকাদান রেকর্ড উল্লেখিত আছে।
২১ মে ২০২৫, কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ‘ স্কুল শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য কার্ড ’ প্রদানের মাধ্যমে এর শুভ সূচনা। মূলতঃ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র এর সোৎসাহ প্রেরণায় এই কর্মযজ্ঞের শুরু। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ৫৫ টা স্কুলে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমে এই কার্যক্রমের আওতায় আসবে। ইতোমধ্যে স্কুল হেলথ টিম ০৯ টা স্কুলের সকল শিক্ষার্থীর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। পরবর্তীতে তা থেকে চিহ্নিত পড়ুয়াদের দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর প্রধান স্বাস্থ্য কমকর্তা, অন্যান্য চিকিৎসকবৃন্দ এবং সাহিক এর সহযোগিতাপ্রসূত নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সমৃদ্ধ মেডিক্যাল টিম নিরলসভাবে এই কর্মকাণ্ডে শামিল হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এ পর্যন্ত যেসব কর্মকান্ড সম্পন্ন হয়েছে তার একটা পরিসংখ্যান নিম্নরুপ–
ক) স্কুল শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা:- ৫৫টি। (মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়)।
খ) বিতরণকৃত হেলথ কার্ডের সংখ্যা:- ৩১,৫০০টি। (মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়)।
গ) হেলথ ক্যাম্প পরিচালিত হওয়া বিদ্যালয়ের সংখ্যা:- ০৯টি। (মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন))। চিকিৎসাপ্রাপ্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা:- ১,০৭৫ (এক হাজার পঁচাত্তর) জন।
উপসংহার:
সুস্থ শিশুই সেরা শিক্ষার্থী। স্কুল স্বাস্থ্য কর্মসূচী জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। বিশ্ব–স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মতো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যকর আচরণ একান্ত জরুরি। দৈহিক, মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি, স্কুল রোগতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা কর্মসম্পৃক্ত স্কুল পড়ুয়াদের শিশু–জীবন নীরোগ দেহ নির্মল মন নিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
এই মহৎ কাজে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চিকিৎসক মেয়রের ঐকান্তিক উপস্থিতি অণুপ্রেরণাদায়ক। অনেক বছর ধরে শিশুচিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে লেখালেখি ও কর্মপ্রচেষ্টায় আমি এরূপ একটা সমন্বিত ‘স্কুল–স্বাস্থ্য’ কর্মপ্রণালীর সফল বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছিলাম। দেশের প্রতিটা স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য এই ‘স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম’ পরিচালিত হলে তা হবে আমার শিশু–চিকিৎসক জীবনের শ্রেষ্ট স্বপ্নপূরণ।
লেখক: সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও উপদেষ্টা, স্কুল হেলথ সেন্ট্রেল ক্লিনিকেল টিম,
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।











