ড. হান্স হার্ডারের গবেষণা : ‘গফুর হালীর গান, ভালোবাসার অলৌকিক শিল্প’

নাসির উদ্দিন হায়দার | রবিবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

আবদুল গফুর হালীর দ্বিতীয় গীতিকাব্য হলো ‘জ্ঞানজ্যোতি’ (প্রকাশ ১৯৮৯ সাল)। গ্রন্থের ‘আমার কিছু কথা’ অংশে গফুর হালী লিখেন, ‘মহাজ্ঞান সমুদ্র মাইজ ভাণ্ডার দরবার শরীফ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই পবিত্র দরবারে অধ্যাত্মিক ফয়েজের জন্য মুক্তির আশায় বৎসরে অন্তত তিনবার হাজিরা দেয়। আমিও এই দরবারের নগণ্য একজন।’

আসলেই মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ হলো মহাজ্ঞান সমুদ্র, টানা ছয় দশক ধরে সেই জ্ঞানসমুদ্র থেকে মণিমুক্তা আহরণ করেছেন সংগীতজ্ঞ আবদুল গফুর হালী। গফুর হালীর পুঁথিগত ও প্রথাগত শিক্ষা সামান্যই, কিন্তু তিনি লোকশিক্ষায় শিক্ষিত, ঐশীপ্রেমে দীক্ষিত। শুধু সংগীতসাধনার মাধ্যমে স্বশিক্ষিত এই শিল্পী অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন। আবদুল গফুর হালী বাংলাদেশের লোকসংগীতের এক কিংবদন্তীর নাম, চাটগাঁইয়া গানের মহাজন। তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ও মাইজভাণ্ডারী গানের নবযুগের স্রষ্টা।

১৯৫৫/৫৬ সালের দিকে মাইজভাণ্ডার দরবারে গমন, সেখানে প্রথম মরমী সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে গফুর হালীর শিল্পীজীবন শুরু। কিন্তু মাইজভাণ্ডার দরবার থেকে বাড়িতে ফেরেন মজ্জুবের বেশে এবং হালীর ভাষায় কে যেন তাকে বারবার বলছে ‘লেখ, লেখ, লেখ’। ঐশীপ্রেমে মশগুল হয়ে তিনি পথ থেকে একটি কাগজ কুড়িয়ে জীবনে প্রথম পদ লিখলেন

আর কতকাল খেলবি খেলা/ মরণ কি তোর হবে না / আইল কত গেল/ কোথায় তাদের ঠিকানা।’

আবদুল গফুর হালীর প্রথম সৃষ্টি মাইজভাণ্ডারী সাধনসংগীত। এরপর ছয় দশক ধরে সংগীতই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। গান হচ্ছে তার কাছে ইবাদত। সংগীতের মাধ্যমেই স্রষ্টাকে পাওয়ার সাধনা করেছেন গফুর হালী।

গানের অর্থ না বুঝিলে তার লাগিয়া গান হারাম/ একমণ স্বর্ণ দিলেও হয় না একটা গানের দাম।

(সুরের বন্ধন, সম্পাদনানাসির উদ্দিন হায়দার, প্রকাশকসুফী মিজান ফাউন্ডেশন)

গত দুই দশক ধরে বাংলা লোক সংগীতের ধারায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক, মাইজভাণ্ডারী ও মরমী গানের কিংবদন্তী আবদুল গফুর হালীর সংগীতসাধনার স্বরূপ সন্ধান করছেন ভিনদেশী গবেষকরা। তাদের একজন জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হান্স হার্ডার, অপরজন আমেরিকার আটলান্টা ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং সহকারী অধ্যাপক ড. বেঞ্জামিন ক্রাকাউর। তারা দুজনেই আক্ষরিক অর্থে গফুর হালীর সংগীতসাধনার আধ্যাত্মিক চেতনা আত্মস্থ করেছেন। আমেরিকার বিশ্বখ্যাত সামাজিক নৃবিজ্ঞানী পিটার বার্টুসি আবদুল গফুর হালী সম্পর্কে বলেছেন– “Best known maijbhandary composer।’ (সূত্র -Peter J. Bertocci, Sufi Movement in Bangladesh: The Maijbhandary Tariqa and its Followers”, Contribution to Indian Sociology, Vol. 40, No. 1, 2006, page: 16.)

. হান্স হার্ডার আবদুল গফুর হালীকে নিয়ে প্রায় অর্ধযুগ গবেষণার পর ২০০৪ সালের দিকে জার্মান ভাষায় ‘ডার ফেরুখটে গফুর স্প্রিখ্‌ট’ (পাগলা গফুর বলে) নামে একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, যেখানে আবদুল গফুর হালীর ৭৬টি মরমী ও মাইজভাণ্ডারী গান জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এসব গানের স্বরূপ সন্ধানে ড. হান্সের হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণ রয়েছে ওই গ্রন্থে। গফুর হালীর এসব গানকে তিনি ‘পূর্ব বাংলার মরমী গান’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেন, ‘গফুর হালী এমন কিছু পংক্তি রচনা করেছেন, যাতে তিনি তার প্রভু আল্লাহর কাছে আধ্যাত্মিক গানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জীবনের সন্ধান খুঁজে বেড়ান। তার মতো অসংখ্য গায়ক ও সাধক নানাভাবে মাইজভাণ্ডারী গান পরিবেশন করে আধ্যাত্মিক দর্শনের মাধ্যমে আল্লাহকে খুঁজে পেতে চান।’

. হান্স হার্ডার মূলত ১৯৯৯ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাবাদ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। মাইজভাণ্ডারী দর্শন নিয়ে গবেষণা করতে এসে আবদুল গফুর হালীর সন্ধান পান। পরে তিনি হালীর জীবনদর্শন ও গান নিয়ে জার্মান ভাষায় গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন।

. হান্স ‘ডার ফেরুখটে গফুর স্প্রিখ্‌ট’ গ্রন্থে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, মাইজভাণ্ডারী দর্শন ও আবদুল গফুর হালীর জীবন ও গান নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। শেষ অধ্যায়ে গফুর হালীর ৭৬টি গান জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে অন্তর্ভূক্ত করেন এবং এসব গানের ভাববিশ্লেষণ করেন। গফুর হালী সম্পর্কে তিনি লিখেন, ‘আবদুল গফুর হালী নামের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি বা উপাধি না থাকলেও তথাপি তিনি নিজের চেষ্টায় অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন।তার সাহিত্য ও দর্শন সাধনা চট্টগ্রামের একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন এবং সেই উৎসবে ক্রমাগত যাতায়াতের মাধ্যমে। প্রায় প্রতিদিনই তিনি মাইজভাণ্ডারী গান রচনা করেন। ভালোবাসার এক অলৌকিক শিল্প তাঁকে টালমাটাল করে তোলে। ঐশ্বরিক এক শক্তি তাঁর নিজস্ব দর্শনকে পরিচালিত করে থাকে।’

আবদুল গফুর হালী সংগীতের বরপুত্র, বিশ্ব যার সুরের সৌরভে মোহিত। নম্বইয়ের দশকের শেষদিকে মোবাইল ও স্যাটেলাইটের আগ্রাসনে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক সংগীত ধারায় মন্দা আসে। শিল্পীর পক্ষে গান লিখে আর গেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সময় চট্টগ্রামের বনেদী শিল্পগোষ্ঠী পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও তার পরিবারের বিরল ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন এই গফুর হালী। বলা যায়, ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা দুই দশক শিল্পী গফুর হালীকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সন্তানের মতো লালনপালন এবং তার সৃষ্টির পরিচর্যা করেছেন সুফী মিজান ও তার সন্তানরা।

সুফী মিজান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও মোহাম্মদ আনোয়ারুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় আবদুল গফুর হালীর চারটি গবেষণা গ্রন্থ ‘সুরের বন্ধন’ ও ‘চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র্র’ (সম্পাদনানাসির উদ্দিন হায়দার), ‘শিকড়’ (সম্পাদনামোহাম্মদ আলী হোসেন) এবং ‘দিওয়ানে মাইজভাণ্ডারী’ (সম্পাদনামোহাম্মদ মহসিন) প্রকাশিত হয়েছে। তিনটি গীতিকাব্য ‘সুরের বন্ধন, শিকড় ও দিওয়ানে মাইজভাণ্ডারী’ বইয়ে ৩০০ গানের স্বরলিপি করা হয়েছে, এটা বিরল ঘটনা। কারণ হাজার বছরের চাটগাঁইয়া গানের ইতিহাসে গফুর হালী ছাড়া আর কোন শিল্পীর গানের স্বরলিপি হয়নি।

অর্থসংকট দূর হওয়ায় আবদুল গফুর হালীর সংগীত জীবনের শেষ অধ্যায়টা কেটেছে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। এই সময় আন্তর্জাতিক স্কলারদের নজর পড়ে তার উপর। গফুর হালীর গানগুলো গ্রন্থবদ্ধ থাকায় পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা গবেষকদের জন্য শিল্পীর স্বরূপসন্ধান সহজ হয়, গবেষণায় গ্রন্থগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আবদুল গফুর হালীর চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র’ গ্রন্থে ‘টলমল মানবজীবন, কচু পাতার পানি যেমন’ শীর্ষক ড. হান্স হার্ডারের একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেই প্রবন্ধে ড. হান্স লিখেন, ‘আবদুল গফুর হালীকে নানা অভিধায় সম্বোধিত করা হয়েছে। গীতিকার, লোককবি, মারফতি গানের রচয়িতাআর হয়তো বা লোকসাহিত্যিকও বলা হয়েছে তাঁকে। এই ‘লোক’কে বাদ দিয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ‘সাহিত্যিক’ও বলা যায় কি না, সেটাই আমার প্রশ্ন। আধুনিককালে আমরা সাহিত্য এবং লোকসাহিত্য এই দুটোর মাঝখানে একটা সীমারেখা টানতে অভ্যস্ত হয়েছি। একদিকে সাহিত্যিকদের আধুনিক ধারার অবলম্বনে রচিত গল্প, উপন্যাস কবিতা ইত্যাদি। আর অন্যদিকে লোকায়ত প্রাগাধুনিক রীতিতে রচিত গানগীতিরূপকথা যেগুলো বেশিরভাগ মৌখিক পরম্পরাসূত্রে হস্তান্তরিত হয়ে আমাদের কাছে চলে এসেছে। সাহিত্যলোকসাহিত্যের এই বিভাজনটি আবার একটা সূক্ষ্ম মূল্যায়নও বয়ে নিয়ে আসে : সাহিত্য যেন একালের সামগ্রী, বুদ্ধিজীবীদের এলাকা, আজকের সমাজের পক্ষে প্রাসঙ্গিক একটি বস্তু। পক্ষান্তরে লোকসাহিত্য যেন সেকেলে ঐতিহ্যের জিনিস, ভোলা গ্রামীণ মাঠের ফসল এবং আজকালকার সমাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে যে গফুর হালীর মতো লেখকই আমাদের শিখিয়ে দিতে পারেন যে, এই সীমান্তরেখা ক্ষেত্রবিশেষে কত কৃত্রিম হতে পারে। ‘টলমল মানব জীবন/কচুপাতার পানি যেমন’ তার গানের একটি কলি দ্রষ্টব্য : এমন সমাজব্যবস্থা, প্রাচীন হোক বা আধুনিক হোক, কল্পনা করা মুশকিল যেখানে এমন কথা ভাবের আলোড়ন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। পাগলের নাচ, নৌকাপাড়ি, খেলার ছল, সঠিক পথ ধরাগফুর হালীর গানের এমন সব উপাদান আমাদের এই আধুনিক জীবনেও কতটা উপযোজ্য সেটা বলাই বাহুল্য। সুতরাং তাঁকেতাঁর রচনাকে আমরা লোকসাহিত্যের তথাকথিত সেকেলে প্রান্তসীমায় নির্বাসিত করব কেন? আমরা সাহিত্যের মাঠ ব্যাপক রেখে গফুর হালীদের জন্যেও ঠিকমত জমি বেঁটে দিলে সবদিক দিয়ে লাভজনক হবে বলে মনে হয়।’

আবদুল গফুর হালী একজন আধ্যাত্মিক সাধক, তবে সবার আগে তিনি একজন মানুষ। তার সংসার আছে, জাগতিক ক্রিয়াকর্ম দায়িত্বের সাথেই পালন করেন। তাই গফুর হালীর গানে আধ্যাত্মবাদের জয়গান যেমন আছে, তেমনি তিনি বাংলার রূপ, প্রকৃতির সুরকে উপেক্ষা করতে পারেননি, তাই গফুর হালীর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেরও কিংবদন্তী রচয়িতা। গফুর হালীর গানে সাগরনদীপাহাড়ের সুর শোনা যায়, নরনারীর প্রেমবিরহ কিংবা আধ্যাত্ম চেতনা ওতোপ্রোতভাবে মিশে আছে। তাইতো কেবল গফুর হালীই লিখতে পারেন

আমি আমারে বেইচা দিছি মাইজভাণ্ডারে যাইরে / আমার কিছু নাই আমার কেহ নাইরে / আমার কিছুই নাই’

গফুর হালী সম্পর্কে ড. হান্স হার্ডারের মূল্যায়ন-‘আমিও ১৯৯৯ সালে যখন মাইজভাণ্ডার গিয়ে মাইজভাণ্ডারী দরবারদর্শনতরিকা নিয়ে গবেষণা শুরু করি তখন এসব কিছুই বুঝতাম না। মধ্যযুগীয় বাংলা ভক্তিগীতি অল্পএকটু পড়ে গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে গেলেতার ‘পরশ’ লাগেনি। আবদুল গফুর হালীর গান পড়তে পড়তে, তাঁর সংস্পর্শে এসে, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে বিচ্ছেদের গানের বিচ্ছেদটা কত তীব্র, কত সার্বভৌমিক, কত আধুনিক হতে পারে। ভক্তির ভাবজগতের হাতেখড়ি আমি তাঁরই কাছে পেলাম। আর এই শিক্ষা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়আমি তো মুসলমানই নই, বরং এক অর্থে এটা মানুষমাত্রেরই যথার্থ অর্থে ‘মানুষ’ হওয়ার একটা পদ্ধতি।’ (সূত্র: আবদুল গফুর হালীর চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র’)

আবদুল গফুর হালী চাটগাঁইয়া গানের বরপুত্র। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশ্ব পরিসরে আরও মূল্যবান গবেষণা হোক, এটাই কামনা।

লেখক: সাংবাদিক এবং লোকসংগীত গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউষর মরুতে স্বদেশী ভ্রাতা
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ