আর মাত্র দু–বছর মাথায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে যে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছে তা হলো, ডানপন্থী নেত্রী হিসাবে পরিচিত মারিন ল পেন কি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন? বিশেষ করে গেল বছরের ৩১ মার্চ ফরাসি আদালত তাকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার পর ধারণা করা হচ্ছে আইনগত জটিলতার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত হয়তো নির্বাচনী দৌড়ে পিছুটান দেবেন। যদি তেমনটি ঘটে তা হলে বড় প্রশ্ন মাইনাস–ল পেন তার দল, দ্য রাসেম্বলমেন্ট ন্যাসিওনাল (Rassemblement Nation) বা সংক্ষেপে ‘আর এন‘-এর ভবিষ্যৎ কী হবে? কেমন হবে ফরাসি রাজনীতিতে ডান রাজনীতির অগ্রযাত্রা যা বিগত সময়ে ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ল পেন এবং তার দল দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি জাতীয় পরিষদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিলো। এখন প্রশ্ন যদি তেমনটি ঘটে তাহেল কি ল পেন পুননির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন? তাকে কি ভিন্ন কোন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে? ফরাসি এই ডান নেত্রী গত ৩১ মার্চ আদালতের রায়ে অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফরাসি আপিল আদালত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তহবিল সুপরিকল্পিতভাবে অপব্যবহারের দায়ে ল পেনকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি বহাল রাখে এবং উল্লেখযোগ্য শাস্তির বিধানও অপরিবর্তিত রাখে। অর্থাৎ তিন বছরের কারাদণ্ড–যার মধ্যে এক বছর গৃহবন্দী অবস্থায় ইলেকট্রনিক ট্যাগ (নজরদারি যন্ত্র) পরিধান করে কাটাতে হবে–এবং ১ লাখ ইউরো (১ লাখ ১৪ হাজার ডলার) জরিমানা দিতে হবে। তবে সরকারি পদে আসীন হওয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে ৪৫ মাস করা হয়; এর মধ্যে ৩০ মাসের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা হয়। বাকি (কার্যকর) ১৫ মাসের সাজা ইতিমধ্যে ভোগ করা হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। ফলে ল পেনের অবস্থান দাঁড়াল এমন যে, তিনি খালাসও পেলেন না আবার কেবল সাময়িক রেহাইও পেলেন না–তিনি একজন দোষী সাব্যস্ত রাজনীতিবিদ হিসেবেই রইলেন, যাঁকে প্রকৃত কারাবাসের মতো বিধিনিষেধের সাজা দেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার যোগ্যও বিবেচিত হলেন। এমন অবস্থায় তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্যে লড়বেন কিনা সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।
এই রায়, অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকারের মতে ল পেনের জন্যে আশীর্বাদ। এই রায় কট্টর ডানপন্থীদের পরোক্ষভাবে সুবিধা করে দিচ্ছে। তারা এই রায়কে তাদের বিরুদ্ধে ‘সরকারি সিস্টেমের আক্রমণ‘ হিসাবে দেখাতে চাইছে। অনেকটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত। একে কাজে লাগিয়ে তারা পপুলিস্ট–প্রচার চালাবে, বলবে, দেখুন আপনাদের মত আমরাও কীভাবে এই ব্যবস্থার শিকার। গত নভেম্বর মাস থেকে এই বিচার প্রক্রিয়াকে তারা ‘রাজনৈতিক বিচার’ হিসাবে আখ্যায়িত করে আসছে। যেমনটি করেছিলেন হাঙ্গেরির ভিক্টর অর্বান, ইতালির মাত্তেও সালভিনি এবং হল্যান্ডের গিয়ের্ট বিল্ডার্স। তারা ইতিমধ্যে এই রায়ের ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এরা তিনজনই কট্টর ইউরোপ–সংশয়বাদী (ইউরো–স্কেপটিক) রাজনীতিবিদ। সালভিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশেষ করে ইউরো মুদ্রার বিষয়ে অত্যন্ত সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবৈধ অভিবাসন এবং সেই সাথে আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবস্থাপনার বিরোধিতা করেন। এছাড়া ২০১০–এর দশকে ইউরোপে যে পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী ধারার উত্থান ঘটেছিল, তিনি তার অন্যতম প্রধান নেতা এবং নব্য–জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একজন সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন; এই আন্দোলনটি এমন এক ডানপন্থী মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যা বিশ্বায়ন–বিরোধী অবস্থান, নিজস্ব জাতিসত্তার প্রাধান্য (নেটিভিজম) এবং সংরক্ষণবাদী নীতির ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, বিল্ডার্স মূলত তাঁর ‘রাইট উইং পপুলিশম‘ বা ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদ, ইসলাম ও অভিবাসন–বিরোধিতা সহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন–বিরোধী অবস্থানের (ইউরো–স্কেপটিসিজম) জন্য পরিচিত। তাঁর এসব মতাদর্শ তাঁকে হল্যান্ড ও এর বাইরেও এক বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তার কট্টর এন্টি–ইসলাম অবস্থানের কারণে তার জীবনের উপর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের কাছ থেকে তিনি হুমকি পেয়ে আসছেন এবং সে কারণে ২০০৪ সাল থেকে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশের সুরক্ষাবলয়ে থাকেন। এই ত্রিরত্নের আর একজন হলেন হাঙ্গেরির ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান, যিনি দুই দফায় (১৯৯৮–২০০২ এবং ২০১০–২০২৬ সাল) দেশটি শাসন করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুগত ও আস্থাভাজন হিসাবে তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। শেষ নির্বাচনে তিনি যাতে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় পুনরায় বসতে পারেন, তার জন্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প যারপরনাই প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্সকে হাঙ্গেরি পাঠিয়েছেন। কিন্তু শেষ তক জনগণের বিজয় হয়েছে, বিজয় হয়েছে মুক্ত গণতন্ত্রের। ভিক্টর হেরেছিলেন জনগণের ভোটে।
ফরাসি রাজনীতিতে আর একটি নাম বেশ কিছুদিন ধরে বহুল আলোচিত। তিনি হলেন জর্ডান বারদেলা। বয়সে তরুণ এই রাজনীতিবিদের জন্ম ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫সাল। ২০২২ সাল থেকে উগ্র–ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র্যালি‘ (আরএন)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দলটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সহ–সভাপতি ছিলেন। ২০১৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে আর এন–এর প্রধান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বারদেলা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; এছাড়া তিনি ২০১৫ সাল থেকে ‘ইল–দ্য–ফ্রঁস‘ অঞ্চলের কাউন্সিলর ছিলেন এবং ২০২৫ সালে সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
শোনা যাচ্ছে, মেরিন ল পেন যদি ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, তবে বারদেলা নিজে সেই নির্বাচনে লড়ার জন্য প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহকারী–সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির জেরে ল পেনকে সরকারি পদে আসীন হওয়া থেকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার রায় ঘোষণার পর এই বিবৃতিটি এল বারদেলার কাছ থেকে। বারদেলা তাঁর রাজনৈতিক গুরু ল পেনের নির্দোষিতার ওপর জোর দিলেও, তিনি স্বীকার করেন যে, ল পেন নির্বাচনে লড়তে না পারার সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ‘ল্য পারিজিয়ঁ’ (Le Parisien)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মেরিন নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার রাখেন… এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই যে, মেরিন ল পেনই আমার প্রার্থী। আর যদি তাঁকে নির্বাচনে লড়া থেকে বিরত রাখা হয়, তবে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে তখন আমিই তাঁর প্রার্থী হিসেবে লড়ব। এর চেয়ে স্পষ্টভাবে আর কিছু বলা সম্ভব নয়।‘
সবশেষে, একটা কথা এখানে বলা বাহুল্য যে সামপ্রতিক বছরগুলিতে গোটা ইউরোপ জুড়ে এন্টি–ইউরোপীয় এবং চরম ডান রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থন বাড়ছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, অবৈধ অভিবাসনকে ম্যানেজ করতে ক্ষমতাসীন দলগুলির ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সমুদ্রের স্রোতের মত মানব–মিছিল ইউরোপের দিকে ছুটে আসছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, সীমান্ত বেড়া দিয়েও এদের ঠেকানো সম্ভব হচ্ছেনা। যার কারণে ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী ও লেবার পার্টি নেতা, স্যার ষ্টার কিয়েরমারকে ক্ষমতা ছাড়তে হলো ক্ষমতায় বসার মাত্র দুই বছরের মাথায়। হল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, অস্ট্রিয়া সহ বিভিন্ন দেশে এই সমস্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রান্স বিশাল দেশ। সেখানেও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এই গোষ্ঠী। ল পেন কিংবা তার দল যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে যে কেবল ফ্রান্সের রাজনৈতিক চেহারা বদলে যাবে তা নয়, এর প্রভাব হবে সুদূর প্রসারী, গোটা ইউরোপ জুড়ে। এখন আমাদের দেখার পালা ল পেন আইনের মারপ্যাঁচ কাটিয়ে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন কিনা। সেটি দেখার জন্যে আমাদের আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। (১৬–৯–২০২৬)।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।













