মানুষ জন্মগতভাবে শুধু একটি জৈবিক সত্তা, তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে তোলে তার পরিবার। পরিবারই পারে শিশুদের মানবিক ও সুশৃঙ্খল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। একটি শিশুর জীবনের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষালয় হলো তার পরিবার। বাবা–মা হলেন তার জীবনে প্রথম শিক্ষক। শিশুরা জন্মের পর থেকে বাবা–মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আচরণ, কথা, মূল্যবোধ, ভালোবাসা ও জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে, যা তাদের চিন্তা–চেতনা ও চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার এবং বাবা–মাকে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হয়।
শিশু–কিশোর বয়স থেকে সন্তানদের সাথে বাবা–মায়ের একটা সুন্দর, বন্ধুবৎসল ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। এবং একই সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও একটা আদর্শিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। শিশুরা খুবই অনুকরণপ্রিয়। পরিবার ও বাবা–মায়ের কাজকর্ম, কথাবার্তা, আচার–আচরণ সবকিছু শিশুরা অনুকরণ করে। বিশেষভাবে বাবা–মাকে এমন আচরণ করতে হয়, যা নিজেদের আচরণের ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বাবা–মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা শিশুদের সাথে কথা বলার সময় মার্জিতভাবে কথা বলা উচিত। সাধু, চলিত বা আঞ্চলিক যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, তা হতে হবে সুললিত, সুভাষিত, কোনোভাবেই কর্কশ নয়। শিশুদের সাথে ব্যঙ্গাত্মক, বিদ্রূপাত্মক বা বিকৃতস্বরে কোনো কথা বলা ঠিক নয়। বলতে বা শুনতে ভালো লাগে না এমন শব্দ শিশুদের না শেখানোই ভালো। অনেকে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গী করে আনন্দ দিতে চায়। শিশুদের সাথে তা না করাই ভালো। কারণ বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গী বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। শিশুদের আদর, স্নেহ ও ভালোবাসার মাধ্যমে ভালো–মন্দের পার্থক্য বোঝাতে হবে। কোনটা করলে ভালো, কোনটা খারাপ, তা শিশুদের বোধের মধ্যে নিয়ে আসতে হয়। তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে, বড়দের সম্মান করে কথা বলতে হয়।
শিশুর জন্য পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।একটি শিশু পৃথিবীকে প্রথম চিনতে শেখে পরিবারের মাধ্যমেই। শিশু যখন দেখে তার বাবা–মা অন্যকে সম্মান করছেন, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, অসুস্থ আত্মীয়ের খোঁজ নিচ্ছেন কিংবা কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করছেন, তখন সে বুঝতে শেখে, অন্যের দুঃখ–কষ্ট উপলব্ধি করা ও মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। তখন তার মধ্যে মানবিক গুণাবলির বীজ বপন হয়।
বাবা–মায়ের পারস্পরিক আচরণ সন্তানের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাবা–মায়ের মাঝে ছোটখাটো মতবিরোধ হলে তা কীভাবে সমাধান করছে, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে কীভাবে কথা বলে, পরিবারে অসুস্থ ও বয়স্ক কেউ থাকলে তাদের সাথে কীভাবে ব্যবহার করছে ও যত্ন নিচ্ছে, গৃহকর্মীর সাথে কীভাবে আচরণ করে সবকিছু শিশুরা খেয়াল করে। এমনকি স্কুলে, মার্কেটে বা অন্য কোথাও আসা–যাওয়ার পথে রিকশাচালক, ট্যাক্সির ড্রাইভার বা পথে অন্য কারো সাথে অনাহূত কথা কাটাকাটি হলে তাও শিশুরা খেয়াল করে। তখন বাবা–মা কোনো ধরনের ভুল করলে সাথে সাথেই শিশুদের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। সেক্ষেত্রে সন্তানদের সামনে কোনো ধরনের কটূক্তি, প্রতিবাদ বা কথা না বাড়িয়ে ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। শিশু–কিশোরদের সাথে সবসময় স্বাভাবিকতা বজায় রেখে চলতে হয়। প্রতিটি শিশুর কাছে তার বাবা–মা শুধু অভিভাবক নন, তাঁরা আদর্শও। শিশুরা উপদেশের চেয়ে তাদের কাজ দেখে বেশি শেখে। সন্তানকে সঠিক ও উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বাবা–মাকেও সততা ও নিষ্ঠার সাথে আচরণ করতে হবে।
শিশুরা কোনো কিছু জানার জন্য কৌতূহলী হলে, সে জানতে চাওয়াকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে সুন্দর করে তাদের কথার জবাব দিতে হয়। সবসময় শিশুদের কথা মনোযোগ সহকারে শোনা উচিত। কোনো কাজে ভুল করলে তার জন্য অপমান বা তিরষ্কার না করে তাদের বুঝিয়ে বলতে হয়, সে কী ভুল করেছে এবং তার কী করা উচিত ছিল। কোনোভাবেই ভুলের জন্য মানসিক বা শারীরিক শাস্তি দেয়া ঠিক নয়। তাদের প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা, মানসিক নিরাপত্তা ও বন্ধুসুলভ মনোভাব পোষণ করতে হয়, সন্তান যাতে ভাবে তার বাবা–মা তার ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’। বাবা–মা যদি সুন্দর চলাফেরা, সঠিকভাবে খাওয়া–দাওয়া, সুন্দর কথাবার্তা ও একটি পরিশীলিত সুন্দর জীবনযাপন করে, তা দেখে শিশুরা শিখবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে পাঁচ–সাত মিনিট হালকা শরীরচর্চা করা, ব্রাশ করা, টিফিন নেওয়া, একসাথে সকালের নাস্তা করা ইত্যাদি নিজেরা যা কাজকর্ম করেন, তা একইসঙ্গে শিশুদেরও শেখানো যায়। যেসব গুণগত আচরণ বাবা–মা পালন করবে, একই সাথে শিশু–কিশোরদেরও সেসব গুণাবলিতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে । বাবা–মা নিয়মিত স্নান ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ভালো কাপড়–চোপড় পড়ুন, আপনার শিশুদেরও একইভাবে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখুন। ঘরে বা ঘরের বাইরে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ময়লা–আবর্জনা আপনিও ফেলুন, আপনার সন্তানকেও ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার অভ্যাস করান। ঘর পরিষ্কার রাখা, পড়ার টেবিল, ডেস্ক, কাপড়–চোপড় গুছিয়ে রাখা, স্কুল ড্রেস, জুতা–মোজা, বই, কলম, পেন্সিল, ইরেজার ইত্যাদি পরিপাটি করে রাখার শিক্ষা দিন। প্রতিটি জিনিস যাতে চাইলেই পাওয়া যায়, সেভাবে গুছিয়ে রাখার সুযোগ করে দেন।
মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে যদি মা–বাবা কথা বলে এবং ভদ্র ব্যবহার করে, তাহলে তা আপনার সন্তানও শিখবে। যেমন ‘প্লিজ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘সরি’, ‘এক্সকিউজ মি’এই সৌজন্যসূচক শব্দগুলো যদি মা–বাবা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে সন্তানও সেগুলো শিখবে।
কারও সাথে যদি সন্ধ্যা সাতটায় দেখা করবেন বলে কথা দিয়ে থাকেন, তাহলে ঠিক সাতটায় তার সাথে দেখা করুন। কোনো অনুষ্ঠান পাঁচটায় শুরু করবেন ঠিক করলে, ঠিক সেই নির্দিষ্ট সময়ে তা শুরু করুন।
এতে মানুষের প্রতি ও সময়ের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। সময়ের প্রতি সম্মান ও গুরুত্ব দিলে নিজের দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। যেকোনো কাজের জন্য কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে, সে কাজ যথাযথভাবে সঠিক সময়ে শেষ করুন। এতে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং নিজের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। অর্থাৎ মা–বাবার সময়জ্ঞান থাকলে তা শিশু–কিশোররা অবশ্যই অনুসরণ করবে। কখনো আজকের কাজ কালকে করব বলে ফেলে রাখা ঠিক নয়। সঠিক সময়ে নিজের প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাস করুন। যখন যেখানে যে কাজই করুন না কেন, তা একাগ্রচিত্তে গভীরভাবে মনোনিবেশ দিয়ে সম্পন্ন করুন। সারাদিন যা কিছু কর্ম করেছেন, তা একাগ্র মনে চিন্তা করুন। কী কী কাজ ভালো হয়েছে, কোন কাজটি ভালো হয়নি, কোন ব্যবহারটা ঠিক হয়নি তা নিজের মনের মাঝে বিশ্লেষণ করে ভুল কাজগুলো সঠিকভাবে করার ব্রত নেওয়া এবং সবসময় ভালো চিন্তা, সৎসঙ্গ ও ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন মানুষের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করা। বাবা–মায়ের কুশল চিন্তা শিশুদের সৎপথে চলার জন্য সহায়ক। এধরনের একাগ্রতা ও আত্মপর্যালোচনার অভ্যাস শিশুর মনকে স্থির ও সচেতন হতে সাহায্য করে। তাই রাত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনার সন্তানের সাথে সারাদিনের কাজ নিয়ে আলাপ করুন। সব ধরনের কথা শেয়ার করুন এবং শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন। বাবা–মা বই পড়ুন। বিভিন্ন গল্প, কবিতার সারমর্ম, নতুন নতুন আবিষ্কারের কাহিনি গল্পচ্ছলে আপনার শিশুদের শোনান। তারপর তাদের বই পড়তে দেন। সে সহজেই সেই বই পড়ে ফেলবে। এভাবে শিশুদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলুন।
আমাদের একথা মনে রাখতে হবে যে কোনো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মনকে স্বস্তি ও আনন্দ দেয়। সুশৃঙ্খলতা, যে কোনো কাজকে সহজ করে। মানুষের প্রতি ভদ্রতা, পারস্পরিক সম্পর্ককে সুন্দর করে। সময়ানুবর্তিতা, মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে এবং একাগ্র মনে কাজ করলে, কাজটি সঠিক, সুন্দর ও সুচারুভাবে সুসম্পন্ন করা সম্ভব হয়। ছোটবেলা থেকে অভ্যাসে পরিণত হলে এগুলো চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।
শিশুদের বুঝিয়ে বলুন, পরিষ্কার শরীর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুন্দর স্বভাব মানুষকে উন্নত করে, চিন্তাভাবনাকে সুশৃঙ্খল করে। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকলে নিজের মন পবিত্র থাকে। সুন্দর মন ও স্বচ্ছ মানসিকতা ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে।
এতে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও বিবেকবোধ তৈরি হয়।
একটি পরিবার যদি নৈতিকতা, বিবেক, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন হয় এবং ঐ পরিবারে যদি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সততা, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক চর্চা থাকে, তাহলে সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যেও মানবিক গুণাবলি বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই বলা যায় শিশুদের মানবিকতার প্রথম পাঠশালা হলো তার পরিবার।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।













