আমাদের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম প্রাচ্যের রানি হিসেবেই সুপরিচিত। নদ–নদী ও সমুদ্র–বেষ্টিত এবং সুউচ্চ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এমন সুন্দর শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। প্রাচীনকাল থেকেই অনেক পাহাড়ি ছড়া, পাহাড়ি নদী, অসংখ্য খাল, বহু জলাশয় আমাদের শহরের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড়, খাল, নদী ও সমুদ্রের যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও আমাদের নাগরিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় জলাশয় সমূহের ভূমিকাও অপরিসীম।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত এ অঞ্চলে অসংখ্য ঐতিহাসিক জলাশয়, দিঘি, কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক লেক, অসংখ্য নদী এবং হাজার হাজার পুকুর বিদ্যমান। যেগুলো পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। চট্টগ্রামের জলাশয়গুলোকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রধান প্রধান নদীসমূহ, কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক লেক, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী দিঘি এবং পুকুর ও জলাশয়। আমাদের চট্টগ্রাম জেলা ও উপজেলায় অনেক জলাশয় রয়েছে। আমাদের ভালোলাগার বিষয় এবং গর্ব করার মতো রয়েছে কর্ণফুলী নদী, হালদা নদী, সাঙ্গু নদী ও মাতামুহুরী নদী। আমাদের আছে ফয়েজ লেক, মহামায়া লেক, ভাটিয়ারী লেক, কাপ্তাই লেক। আরো আছে লালদিঘি, আসকার দিঘি, রানীর দিঘি, বলুয়ারদিঘি, ভেলুয়ার দিঘি, জোড়াদিঘি, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পুকুর।
উপজেলাগুলোতে আছে অনেক ঐতিহ্যবাহী ও নামকরা পুকুর ও দিঘি। যেমন পটিয়ায় পরীর দিঘি, পাইকপাড়া পুকুর, চাপড়া পুকুর, শিকলবাহা পুকুর উল্লেখযোগ্য। আনোয়ারায় আছে কালাবিবির দিঘি ও মনু মিয়ার দিঘি, মিরসরাইতে আছে মগাদিয়া, সোনা পাহাড় ও দুর্গাপুর দিঘি। রাউজানে আছে পাহাড়তলি পুকুর, কাগতিয়া পুকুর ও বিনাজুরি পুকুর। সীতাকুণ্ড ডেবা, ফটিকছড়ির ফালাহ গাজী দিঘি এবং হাটহাজারীর আলাওল দিঘিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে এক সময় অসংখ্য দিঘি, পুকুর ও জলাশয় ছিলো। প্রাচীন কাল থেকেই ধনাঢ্য ব্যক্তিরা জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে এবং সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যে বিশাল বিশাল দিঘিগুলো খনন করতেন। নিজেদের নামে কিংবা বংশের নামে সেগুলোর নামকরণ করা হতো। ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে’ চট্টগ্রাম নগর ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বংশের নামে খনন করা ৩৭৬ টি দিঘির কথা উল্লেখ আছে। নগরবাসীর পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জলাধারগুলো মানুষের জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো। চট্টগ্রাম শহরের অনেক এলাকাকে পুকুর ও দিঘির নামে চেনা যায়। অনেক দিঘি এখনো বিদ্যমান রয়েছে, আবার কালের পরিক্রমায় অনেক পুকুর ও দিঘি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রতিবছর চট্টগ্রামে জলাশয়ে প্রায় ১০ শতাংশ করে কমে যাচ্ছে বলে জানা যায়। অযত্ন, অবহেলা আর তত্ত্বাবধানের অভাবে প্রায় বিপন্ন হতে চলেছে এবং সংকুচিত হতে চলেছে এনায়েত বাজার এলাকার রানির দিঘি, দামপাড়ার মসজিদ গলির পুকুর, কাজীর দেউড়ির আসকার দিঘি, চান্দগাঁও–এর মৌলভী পুকুর, বহদ্দারহাটের মাইল্ল্যার পুকুর, খতিবের হাট পুকুর, কাট্টলীর চৌধুরীর দিঘি পদ্মপুকুর, হালিশহরের খাজা দিঘি, আগ্রাবাদ ঢেবা, মিনামার দিঘি, কর্নেল দিঘি, হাজারীর দিঘি, কারবালা পুকুর, ভেলুয়ার দিঘি।
একেবারেই বিপন্ন হয়ে গেছে রহমতগঞ্জের দেওয়ানজী পুকুর, আন্দরকিল্লার রাজাপুকুর, নন্দন কাননের রথের পুকুর, গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের পাশে পাহাড় বেষ্টিত প্রাকৃতিক হ্রদ চট্টগ্রামের মানুষ যেটাকে ডেবা বলেই জানে, ফিরিঙ্গি বাজারের দাম্মোপুকুর, চকবাজারের কমলদহ দিঘি, মোহাম্মদ খাঁ দিঘি, হামজারবাগ এলাকার হামজা খাঁ দিঘি, পাহাড়তলীর পদ্মপুকুর, বাকলিয়ার আব্দুল্লাহ সওদাগর পুকুরসহ অসংখ্য পুকুর ও দিঘি। সগৌরবে ঐতিহ্য নিয়ে এখনো যে কয়েকটা দিঘি ও পুকুর টিকে আছে তার মধ্যে লালদিঘি, আসকার দিঘি, রানির দিঘি, বলুয়ার দিঘী, বায়েজিদ বোস্তামী মাজারের পুকুর, বড় মিয়া মসজিদের বড় পুকুর, শোলকবহরের মুন্সিপুকুর উল্লেখযোগ্য।
লালদিঘি:
চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি নগরীর প্রাণকেন্দ্র আন্দরকিল্লার খুব কাছেই ২.৭০ একর জায়গা জুড়ে আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে সাগৌরবে টিকে আছে। এই ঐতিহাসিক লালদিঘির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিবিড় মেলবন্ধন। লালদিঘির পূর্বপাশে চট্টগ্রাম কারাগার এবং দক্ষিণপাশে জেলা পরিষদ ভবন, পাবলিক লাইব্রেরি ও ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানের অবস্থান। ইতিহাস থেকে জানা যায় ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে জমি সংক্রান্ত তফসিল অফিসটি লাল রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। লালরঙের কারণে লোকজন এটিকে ‘লালকুঠি’ নামেই চিনতো। লালকুঠির পূর্ব পাশেই ছিলো জেলখানা। জেলখানাও লাল রঙের ছিলো বিধায় এটিও ‘লালঘর’‘ নামে পরিচিতি লাভ করে। লালকুঠি ও লালঘরের পাশে ছিলো একটি পুকুর। ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে পুকুরটিকে বড় করে দিঘিতে পরিণত করা হয়। লাল রংয়ের দুটি ভবনের কাছে ছিলো বিধায় দিঘিটি লালদিঘি নামে পরিচিতি লাভ করে। লালদিঘিকে ঘিরে মানুষের মুখে বিভিন্ন ধরনের চমৎকার চমৎকার কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এ ধারণাও প্রচলিত আছে যে, ইংরেজ শাসনামলে এক লাল মেমসাহেবের নির্দেশে কিংবা লাল মেমসাহেবের স্মরণে দিঘিটি খনন করা হয়েছিলো বলেই এই দিঘির নামকরণ হয় লালদিঘি। লোকমুখে কিংবা ইতিহাসে যতো কিংবদন্তী থাকুক না কেনো এটা সত্যি যে, আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা লালদিঘি ব্যস্ত নগরবাসীর কাছে আজও মুক্ত আকাশ ও নির্মল বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে নির্ভরযোগ্য এক জায়গা। নগর জীবনের কোলাহলের মাঝে নির্মল স্বচ্ছ শান্ত পানির জলাশয়ের ধারে ওয়াক–ওয়েতে প্রতিদিন অবসরে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান। শহরে খোলামেলা জায়গা না থাকায় নগরবাসীর কাছে লালদিঘির আশেপাশের জায়গাগুলো অনেক স্বস্তির। এখানে এসে সারা দিনের ক্লান্তি দূর করেন অনেকেই। ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ লালদিঘি মাঠ ঘিরে অজস্র গল্প আছে। আন্দোলন, সংগ্রামের স্মৃতি বিজড়িত এ জায়গায় অনেকেই দারুন স্বস্তি বোধ করেন। ইতিহাস ও কিংবদন্তির দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় লালদিঘি আজও নগর জীবনের এক জীবন্ত অধ্যায়। এটি চট্টগ্রাম নগরীর ইতিহাস ঐতিহ্য ও আন্দোলন সংগ্রামের স্মৃতির প্রতীক এবং পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যে স্বস্তি খুঁজে নেওয়ার উন্মুক্ত পরিসর। ঐতিহ্যের অংশ লালদিঘি ও এর আশেপাশের পরিবেশকে সংরক্ষণ করে খোলামেলা পার্কটিকে আরো সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ করাই হলো আমাদের আগামীর প্রত্যাশা।
আসকার খাঁ দিঘি:
চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র জামাল খান এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জলাধার আসকার খাঁ দিঘি প্রায় ৩৫০ বছরেরও পুরনো। ১৬৬৬ সালে আরাকানদের পরাজিত করে চাটিগাঁ (চট্টগ্রাম) দুর্গ দখল করে দ্বিতীয় মুঘল শাসনকর্তা আস্কর খাঁ এই দিঘি খনন করেন। আস্কর খাঁ এর দুর্গে প্রায় ১০ হাজার মোগল সৈন্য থাকতো। সৈন্যদের দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানোর জন্যেই এই বিশাল দিঘিটি খনন করা হয়েছিলো। বর্তমানে এই দিঘির নামানুসারেই চারপাশের এলাকা আসকার দিঘির পাড় নামে অধিক পরিচিত। এই দিঘির চারপাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আনসার ও ভিডিপি আঞ্চলিক অফিস, লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মসজিদ, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে। যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব, অবৈধ দখল এবং ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে ঐতিহাসিক এই দিঘিটি মারাত্মক দূষণ ও সংকটের মধ্যে পড়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখে বুঝার উপায় নেই যে এটি ঐতিহাসিক একটি দিঘি। দিঘির উপরিভাগে পানিতে এতোটাই কচুরিপানা জন্মেছে দেখে মনে হয় যেনো সবুজ মাঠ। প্লাস্টিক ও গৃহস্থালী বর্জ্য ফেলার কারণে দিঘির পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। অথচ একসময় নগরের পানির নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই দিঘি। যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে নগরের ঐতিহ্যবাহী গুরুত্বপূর্ণ এ জলাধার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনন্তকাল যেনো টিকে থাকতে পারে নগরবাসীর এটাই প্রত্যাশা।
বলুয়ার দিঘি:
চট্টগ্রাম নগরীর কোরবানীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী জলাধার বলুয়ার দিঘি প্রায় ২ শত বছরেরও বেশি পুরনো। আন্দরকিল্লা থেকে টেরিবাজার হয়ে কোরবানীগঞ্জের রাস্তা ধরে উত্তর দিকে গেলেই দেখা মিলবে ঐতিহ্যবাহী বলুয়ার দিঘির। একটি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় মোগল আমলে ঐতিহাসিক এই দিঘিটির গোড়াপত্তন করেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জমিদার ভুলু পোদ্দার। প্রভাবশালী স্বর্ণ ব্যবসায়ী ভুলু পোদ্দার তাঁর নিজের কাছে রক্ষিত স্বর্ণের পাত বিক্রি করে জঙ্গলাকীর্ণ, ঝোপ–ঝাড়ে ভরপুর জায়গা কিনে নেন। জনকল্যাণমূলক চিন্তাভাবনা থেকেই বিশাল সাইজের সেই অনাবাদি এবং পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী নিজের কেনা জমির উপর দিঘি খনন করে জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তখন দিঘিটি ‘ভুলু পোদ্দার দিঘি‘ নামে পরিচিত ছিলো। কালের বিবর্তনে ভুলু পোদ্দারের দিঘি ‘বলুয়ার দিঘি‘ নামে প্রসিদ্ধ হয়। ধীরে ধীরে বলুয়ার দিঘির মালিকানাও পরিবর্তন হতে থাকে। বলুয়ার দিঘির চারপাশের পাড়ের অংশে বর্তমানে অনেক মালিক রয়েছেন। জানা গেছে শতো বছরের পুরোনো বলুয়ার দিঘিটি ভরাট হতে হতে আগেকার জৌলুস হারিয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছে। বলুয়ার দিঘির আশেপাশেই জামে মসজিদ, খানকাহ শরীফ, অভয়মিত্র মহাশ্মশান, কালিবাড়ি ও চারটি নামকরা স্কুলের অবস্থান। এখানে মসজিদ মন্দিরসহ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর সহাবস্থান দেখে অনুমান করা যায় যুগ পরম্পরায় এ এলাকায় ধর্মীয় সমপ্রীতির বন্ধন কতোটা দৃঢ়। দিঘির অনতিদূরেই চাক্তাই–খাতুনগঞ্জ নামের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বাণিজ্যিক এলাকার অবস্থান। প্রতিদিন অগণিত মানুষ দিঘির পানিতে গোসল করেন। তবে দিঘির স্বচ্ছ জল এখন আর নেই। নোংরা এবং ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দিঘিরপাড় লাগোয়া মসজিদের মুসল্লিরা এই পানিতে অজু করতেও বিব্রত বোধ করেন। বলুয়ার দিঘি সুন্দরভাবে সংস্কারের মাধ্যমে এলাকার জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকুক এবং নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারে দিঘির স্বচ্ছ জল মানুষের মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে সত্যিকারের স্বচ্ছ জলের দিঘি হয়ে উঠুক এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
ভেলুয়ার দিঘি:
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক দিঘি ভেলুয়ার দিঘি বা ভেলুয়া সুন্দরীর দিঘি। এটি পাহাড়তলী ডেবা নামেও পরিচিত। একসময় এর আয়তন ছিলো প্রায় ১৪ একর। চট্টগ্রামের লোকসাহিত্য ও লোকগাঁথার অমর চরিত্র ভেলুয়া সুন্দরী ও আমির সওদাগরের প্রেমকাহিনির সঙ্গে এই দিঘির নাম গভীরভাবে জড়িত। অযত্ন, অবহেলা ও অবৈধ দখলের কবলে ঐতিহ্যবাহী এই দিঘি অন্যান্য দিঘির মতো সংকটের মুখে পড়েছে। চট্টগ্রামের বহু পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ অনন্যসাধারণ দিঘি ভালোভাবে সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। সুন্দরভাবে সংস্কার করে দিঘিটিকে জনগণের সেবায় উন্মুক্ত করে দিলেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
বায়েজিদ বোস্তামী মাজারের পুকুর:
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এর কাছে একটি পাহাড়ের উপরে বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার অবস্থিত। ইরানের বিখ্যাত সুফি বায়েজিদ বোস্তামীর নামে গড়ে উঠা এই মাজার চট্টগ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি চট্টগ্রামে আসা দেশী বিদেশী পর্যটকদের জন্যেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি স্থান। মানুষের ধারণা এখানেই বায়েজিদ বোস্তামীর কবর রয়েছে এবং তাঁরা এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর কবর জিয়ারত করতে যান। কিন্তু আসলে তা সত্য নয়। তাঁর কবর ইরানের সেমনন প্রদেশের বোস্তাম শহরে। চট্টগ্রামে বায়েজিদ মাজারের পাহাড়ের পাদদেশে একটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মুঘল আমলের আয়তাকার মসজিদ এবং তার সামনে একটি বিশালাকার দিঘি আছে। সেই সুবিশাল দিঘিটিতে আছে কাছিম ও গজার মাছ। আঞ্চলিকভাবে এদের মাজারী ও গজারী বলা হয়। বোস্তামীর কাছিম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত বিরল এবং বিপন্নপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ। বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পুকুর ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও এদের দেখা মিলে না বলেই শোনা যায়। মাজারের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মাজার তত্ত্বাবধায়ক কমিটির লোকজন এদের প্রতিপালন করেন। বর্তমানে মাজার প্রাঙ্গণ সংলগ্ন এই দিঘিতে কমপক্ষে সাড়ে তিনশো কচ্ছপের আবাস রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রজনন মৌসুমে মাজারের মূল পাহাড়ের পেছনে এদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে এদের ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। মাজারের ভক্তকূল ও জনশ্রুতি অনুযায়ী মাজার প্রতিষ্ঠাকালে এই অঞ্চলে প্রচুর দুষ্টু জ্বীন এবং পাপীষ্ঠ আত্মার পদচারণা ছিলো। বায়েজিদ বোস্তামী এই অঞ্চলে ভ্রমণকালে এইসব দুষ্টু আত্মাকে শাস্তিস্বরূপ কচ্ছপে পরিণত করেন এবং আজীবন পুকুরে বসবাসের দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। বায়েজিদ বোস্তামীর পুকুর ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় এখনো পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে।
রানির দিঘি:
চট্টগ্রামের এনায়েত বাজার এলাকায় অবস্থিত একটি শতবর্ষী ঐতিহাসিক জলাশয় হলো রানির দিঘি। জনশ্রুতি ও ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায়, রাজা রায় বাহাদুর রাজকমল ঘোষ ১৯৩৯ সালে এই দিঘি খনন করেছিলেন। দিঘির পাড়ে তাঁর স্ত্রী অবসর সময় কাটাতেন। ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দিঘিটি অন্যান্য জলাশয়ের মতো ভরাট, দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবহেলায় দিঘিটি সংকুচিত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর চারপাশের পরিবেশ তার জৌলুস হারিয়েছে।
মুন্সি পুকুর:
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার কাপাসগোলাতে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী জলাধার হলো মুন্সিপুকুর। চট্টগ্রামের অতি প্রাচীন এবং সুপরিচিত এই পুকুরটি ও তার আশেপাশের এলাকা স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি জায়গা। ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি সংরক্ষণের জন্য এবং দখল ও মাটি–ভরাট বন্ধে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট বিশেষভাবে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রতিদিন বহু মানুষ এই পুকুর থেকে উপকৃত হন।
আগ্রাবাদ ডেবা:
চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা হলো আগ্রাবাদ। বহু দেশী বিদেশী কোম্পানিসহ সরকারি বেসরকারি বহুজাতিক ও ব্যক্তি মালিকানাধীন অফিস এবং বড় বড় অট্টালিকার ভিড়ে আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত বিশাল আয়তনের মানবসৃষ্ট জলাশয়টি ‘আগ্রাবাদ ডেবা’‘ নামে পরিচিত।
জানা যায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে বন্দর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের সময় মাটি সংগ্রহের জন্যে এখানে খনন করা হলে এই বিশাল জলাশয়টি তৈরি হয়। এ জলাশয় থেকে পানি সরবরাহ করা হতো রেল ইঞ্জিনে, আবাসিক এলাকায় এবং জাহাজে। অপরিকল্পিত দখল ও দূষণের কারণে ২৭ একর আয়তনের এই জলাধারটির অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। বিশাল দৃষ্টিনন্দন এই জলাশয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক রেখে এর পাড়ে সবুজ উদ্যান এবং হাঁটার পথ তৈরি করা গেলে জলাশয়টির আকর্ষণ অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
চট্টগ্রামের নান্দনিক পাহাড় আর বিস্তীর্ণ মাঠের মতোই জলাশয়গুলোও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের রোষানলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর চট্টগ্রামে জলাশয়ের সংখ্যা ১০ শতাংশ করে কমে যাচ্ছে। জলাশয় ধ্বংসের ফলে শহরের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রাকৃতিক পথ হলো জলাশয়। জলাশয় ভরাটের কারণে পানির স্তর কমে যাচ্ছে, সুপেয় ও ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট দেখা দিচ্ছে, পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, মাছ, পাখি ও জলজ উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে। পানির উৎস কমতে থাকায় অগ্নিকাণ্ডের সময় পর্যাপ্ত পানির সংকট দেখা দেয়। পানির দুষ্প্রাপ্যতাসহ বিভিন্ন বিপর্যয় থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে হলে জলাশয়গুলো রক্ষা করা ভীষণ জরুরি। আশার কথা হলো পরিবেশ রক্ষায় জনগণ এখন অনেক সচেতন। সরকারি বেসরকারিভাবে পরিবেশ রক্ষার নানা উদ্যোগ আমাদেরকে উৎসাহিত করে। প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে আমাদেরকে দান করেছে সুউচ্চ পাহাড়, বহমান নদী, হ্রদ, বিস্তীর্ণ মাঠ, ঘন বন–বনানী। সি.আর.বির সবুজ চত্বর ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো তা বলিষ্ঠভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে রক্ষা করেছে চট্টগ্রামের জনগণ। সমপ্রতি চট্টগ্রামে আরেকটি আন্দোলন শুরু হয়েছে। ‘জলাশয় বাঁচাও আন্দোলন’। চট্টগ্রামের অবশিষ্ট দিঘি ও জলাশয় সমূহ বাঁচাতে এবং ‘জলাশয় বাঁচাও আন্দোলন’কে সফল করতে সেই আন্দোলনের সাথে চট্টগ্রামের সর্বসাধারণ জনগণকে সংযুক্ত হতে হবে।
জলাশয় ধ্বংসের সাথে পরিবেশগত বিপর্যয় যেমন সম্পৃক্ত তেমনি ভবিষ্যৎ অস্তিত্বও হুমকির সম্মুখীন। সরকারের সহযোগিতায় জনসচেতনতা সৃষ্টি করে আমাদের জলাশয়গুলো রক্ষা করা সময়ের দাবি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।












