চট্টগ্রাম বন্দরের ৩০ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত

ইয়ার্ডে আমদানি পণ্য ও কন্টেনারের জট ম আটকে আছে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য জায়গা পুনরুদ্ধার করা গেলে বছরে ১শ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ বিশেষ উদ্যোগ ছাড়া নিস্তার মিলবে না : কর্তৃপক্ষ

হাসান আকবর | বুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে বছরের পর বছর পড়ে থাকা আমদানি পণ্য ও কন্টেনারের জটে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের ৩০ শতাংশের বেশি পরিচালন সক্ষমতা কার্যত অব্যবহৃত হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমসের নিষ্পত্তি বিলম্ব, মূল্যায়ন জটিলতা, আদালতের মামলা এবং নিলামপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে আটকে আছে ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের আমদানি পণ্য। এসব পণ্যের সঙ্গে কন্টেনার ও শিপিং লাইনের ক্ষতি, বকেয়া স্টোরেজ মাশুল এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি যোগ করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো মন্তব্য করেছে।

তারা বলেন, এই জট সরাতে নতুন কোনো টার্মিনাল, জেটি কিংবা ইয়ার্ড নির্মাণের প্রয়োজন নেই। বছরের পর বছর পড়ে থাকা নিলামযোগ্য ও পরিত্যক্ত পণ্য সরিয়ে ফেলতে পারলেই বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে আরও প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য ও কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, শুধু আটকে থাকা পণ্য সরিয়ে ইয়ার্ডের জায়গা পুনরুদ্ধার করা গেলে বছরে ১০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হতো।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত নিলাম, ধ্বংসযোগ্য পণ্য দ্রুত ধ্বংস এবং আইনি জটিলতায় আটকে থাকা পণ্যের বিষয়ে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম নেওয়া গেলে বা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একটি নির্দেশনা এলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাস্টমস, এনবিআর, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আইন মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে বিশেষ উদ্যোগ ছাড়া এই জট থেকে নিস্তার মিলবে না। জট না সরালে বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন।

বন্দর সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টিইইউএস কন্টেনার। এগুলো বন্দরের মোট ইয়ার্ডের প্রায় ২২ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে। এর বাইরে ইয়ার্ডে পড়ে আছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৯৯ প্যাকেজ লেসদ্যানকন্টেনার লোড বা এলসিএল কন্টেনার। ৬ হাজার ৭৯২ প্যাকেজ বাল্ক কার্গো এবং ৭৭৫ প্যাকেজ ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য। এসব পণ্যের কোনো কোনো চালান দুই দশকের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। কিছু পণ্য নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য ও কন্টেনারের বিপরীতে বকেয়া স্টোরেজ মাশুল এখন ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রায় ১০০ কোটি ডলারের এই অর্থ আদায় করতে পারছে না বন্দর। একই সঙ্গে এসব পণ্য জায়গা দখল করে রাখায় নতুন আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এতে জাহাজ এবং কন্টেনারের অবস্থানকাল, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং আমদানিকারকের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়েও সমস্যা হচ্ছে।

একটি কন্টেনারের কথা বলতে গিয়ে বন্দরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ‘সান আলফনসো’ জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা প্লাস্টার অব প্যারিসের একটি কন্টেনার ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৭৬৪ দিন বা প্রায় পাঁচ বছর ধরে পড়ে ছিল। কন্টেনারটির পণ্য আমদানির সময় মূল্য ছিল তুলনামূলকভাবে সামান্য, অথচ দীর্ঘদিন আটকে থাকার কারণে শুধু বন্দরসংক্রান্ত চার্জ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।

আরেকটি ঘটনায় ৬ হাজার ৪৪০ ডলারের একটি আমদানি চালানের ডেমারেজসহ বিভিন্ন চার্জ বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০ ফুটের একটি কন্টেনারের ক্ষেত্রে প্রথম সাত দিন দৈনিক ৬ দশমিক ৯০ ডলার, পরবর্তী সাত দিন ১৩ দশমিক ৮০ ডলার এবং এরপর দৈনিক ১১০ দশমিক ৪ ডলার পর্যন্ত স্টোরেজ চার্জ আরোপের কাঠামো রয়েছে। ফলে সামান্য মূল্যমানের পণ্যও দীর্ঘদিন আটকে থাকলে একপর্যায়ে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ের অংক দাঁড়িয়ে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই সংকটের পেছনে বড় কারণগুলোর একটি হচ্ছে নিলামযোগ্য ও পরিত্যক্ত পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া। কাস্টমস কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে ৬০০টির বেশি পণ্যসংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন। মামলা চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট পণ্য নিলামে তোলা বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে কোনো আমদানিকারক বা পণ্য দাবিদার জয়ী হলে সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক কন্টেনার ইয়ার্ডে আটকে থাকে।

কাস্টমসের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিত্যক্ত পণ্য চাইলেই নিলাম বা ধ্বংস করা যায় না। নিলামের আগে প্রতিটি কন্টেনারের ইনভেন্টরি করতে হয়, পণ্যের অবস্থান ও প্রকৃতি যাচাই করতে হয়, কোনো মামলা বা আইনি বাধা আছে কি না দেখতে হয় এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আদালতে চলমান মামলার ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগতভাবে আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন উল্লেখ করে তারা বলেন, ফলে বন্দরের দাবি অনুযায়ী আটকে থাকা সব পণ্য একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা বাস্তবে সম্ভব নয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বছরের পর বছর পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কার্গো ও কন্টেনার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করেন। চিঠিতে বলা হয়, এসব পণ্যের কারণে বন্দরের ইয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আটকে আছে এবং বকেয়া স্টোরেজ মাশুল ইতোমধ্যে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, নিলামযোগ্য ও পরিত্যক্ত পণ্য সরিয়ে ফেলতে পারলে নতুন বিনিয়োগ ছাড়াই বর্তমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। এতে বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে জাহাজ দ্রুত খালাস ও পণ্য গ্রহণ করতে পারলে আমদানিরপ্তানি কার্যক্রমে গতি আসবে এবং বন্দরের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই ঝামেলা মিটানো সম্ভব হলে বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আয় সম্ভব।

চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫২৬ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪১ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউএসের তুলনায় ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংও রেকর্ড ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টনে পৌঁছেছে। জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪টি। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪ হাজার ৭৭টি। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে বন্দরের ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুরনো পণ্য সরানো গেলে বন্দরের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

বন্দরে কন্টেনার আটকে থাকায় শিপিং লাইনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন একটি কন্টেনার বন্দরে আটকে থাকলে সেটি অন্য কোনো রুটে ব্যবহার করা যায় না। ফলে কন্টেনারের মুভমেন্ট কমে যায় এবং শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন কন্টেনার সংগ্রহ ও পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যায়।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেছেন, আটকে থাকা পণ্যের মূল্য অন্তত ২০০ কোটি ডলার। শিপিং লাইন ও কন্টেনার খাতে ক্ষতি প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। বন্দর কর্তৃপক্ষের বকেয়া স্টোরেজ মাশুল প্রায় ১০০ কোটি ডলার। কাস্টমসের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণও বিশাল। সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতির একমাত্র কারণ বন্দরের ভিতরে আটকে থাকা জঞ্জাল।

অপরদিকে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ও অন্যান্য সংবেদনশীল পণ্য দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ৭৭৫ প্যাকেজ ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য বন্দরে পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব পণ্য সংরক্ষণ করতে গিয়ে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, রাসায়নিক দূষণ কিংবা চুরি ও অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবার বিরুদ্ধে অভিন্ন ধারা ও অভিযোগ
পরবর্তী নিবন্ধখুঁটিতে বেঁধে ও পিঠে ইট তুলে দিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা