১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আসিফের বিরুদ্ধে, অনুসন্ধানে দুদক

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ

| সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের নতুন অভিযোগ পাওয়ার কথা বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, এলজিইডি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। এর বাইরে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক বা ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়া এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নতুন এসব অভিযোগ আসিফের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।

গতকাল রোববার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ। খবর বিডিনিউজ/ বিবিসি বাংলার।

তিনি বলেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ডিসি পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ও শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

কী কী অভিযোগ : দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে। সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্যে আসিফের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ‘হাজার হাজার কোটি টাকা’ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) এই নেতার বিরুদ্ধে। আসিফের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরে প্রকল্পের বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগে।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারি এই ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ‘কোটি কোটি টাকা’ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ : দুদকের নথিতে দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। চার দেশের এসব অঙ্ক যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফের দুই বোন জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।

আগে যে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল : এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অন্য তিনজন হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুবউলআলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ। দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি দল ওই অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফের দায়িত্বকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে দুদক। ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, আসিফের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যাচাইবাছাইয়ে ‘আমলযোগ্য’ বিবেচিত হওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলার সুযোগ নেই।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ : আগের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন আসিফ। তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। পদোন্নতি নিয়ে একটি অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৩৫ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে। তখন তিনি আর সরকারের দায়িত্বে ছিলেন না। ৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়ন করতে ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলামের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে পরে তাকে আইনি নোটিসও পাঠান আসিফ।

বিভিন্ন দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ :

বিভিন্ন দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। ‘অভিযোগ বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে মি. মাহমুদ এমন দাবি করেছেন। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে ওই সংবাদ সম্মেলনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজেরাই এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করেছেন উল্লেখ করে মি. মাহমুদ দাবি করেছেন, বিএনপির সময়ে হওয়া পদোন্নতি, বদলির জন্য আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান হচ্ছে। মানে সার্কাসেরও একটা সীমা থাকা উচিত। ক্লিয়ারলি মিডিয়া ট্রায়ালে ফেলা। এই ভিডিওতে মি. মাহমুদকে বলতে শোনা যাচ্ছে, দুই দিন পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে রিপোর্ট বা নথি চেয়ে সেগুলো নিউজ করানো দুদকের উদ্দেশ্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৬৩ বিদেশির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন