বৃহত্তর চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ঘটনা। (সূত্র :দৈনিক আজাদী ২৩ আগস্ট) পাহাড়ের উপর থেকে আচমকা একটি হাতি রাবার বাগানের ছড়ার খাদে পড়ে যায়। মাঝ বয়সী পুরুষ হাতিটি স্বল্প পরিসরের খাদে এমন ভাবে আটকে যায় যে, আর কিছুতেই উঠতে পারছিল না। দলছুট এ ধরনের হাতিকে মাহুতি ভাষায় ‘মাকনা‘ বলা হয়। দলছুট হওয়ার কারণে পালের হাতিদের সাহায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। উল্লেখ্য যে হাতিরা পা দিয়ে মাটিতে কম্পন সৃষ্টি করার মতো বিস্ময়কর ক্ষমতা রাখে।
এরা অত্যন্ত কম ফ্রিকোয়েন্সের শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করতে পারে। যার মাধ্যমে হাতিরা পায়ের নিচে থাকা সংবেদনশীল কোষ ও জটিল স্নায়ুর মাধ্যমে পরস্পর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এই হাতির সে সুযোগটা ছিল না। যে কারণে পালের হাতিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ রহিত হয়ে যায়। এছাড়াও পালের হাতিরা এত দূরে ছিল যে তার চিৎকারের শব্দ তরঙ্গ তাদের কাছে পৌঁছে নি। উৎসুক জনগণ বন বিভাগকে সংবাদ দেয়। তারা এসে রুদ্ধশ্বাস অভিযানের মাধ্যমে হাতিটিকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
সাধারণ মানুষের ধারণা হাতি মানুষের ক্ষতি করে। কিন্তু উদ্ধারকৃত হাতিটি বনে যাবার সময় তার শুড় উঁচু করে তুলে উপস্থিত জনগণকে সালাম ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেরত যায়। হাতি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল প্রাণী। বুনো হাতিটি জীবন ফিরে পাওয়ায় মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের হাতি ও মানুষের সংঘাত লেগেই আছে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হয়ে আমরা বুঝতে পারি না কেন এই সংঘাত। মূলত মানুষেরা তাদের খাদ্য, চলাচলের করিডর, আবাসন দখল করে আছে। সেই কারণে হাতি সমাজ অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ। এই বিক্ষুব্ধতাই সংঘাতের মূল কারণ। বাংলাদেশের বহুল প্রচলিত একটি স্লোগান “বাধা দিলে বাধলে লড়াই“। প্রকৃতপক্ষে তাই হচ্ছে।
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ১২ই আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়েছে। তারপরও সামপ্রতিক সময়ে আমাদের দেশে হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত ক্রমশ বাড়ছে। বস্তুত হাতি আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ এবং জীব বৈচিত্র্যের একটি অংশ। সুশীল সমাজের কেউ কেউ ‘সংঘাত’ শব্দ প্রয়োগে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। বাস্তবতা হলো হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘাত বিশ্বের হাতি প্রধান এলাকাগুলোতে প্রায়শই চোখে পড়ে। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির হাতি লক্ষ্যণীয়। একটি আফ্রিকান অন্যটি এশীয় প্রজাতির। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, থাইল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে এশিয় হাতিগুলির বসবাস। এশিয়ান হাতির ৬০ শতাংশই ভারতে বাস করে। তবে সামপ্রতিক তথ্যে জানা যায় যে ভারতের ১৮ শতাংশ হাতি কমেছে। বাংলাদেশের ২০১৬ সালের শুমারি অনুযায়ী ২৬৮ টি আছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে বিগত ১০ বছরে ১১০ টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে হাল নাগাদ শুমারি নাই। বন অধিদপ্তর বলছে সমপ্রতি শুমারি শুরু করেছে।
অন্যদিকে হাতির আক্রমণে কতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে কিংবা কতো হাতি মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তার ও সুনির্দিষ্ট হাল নাগাদ তথ্য নেই। সকল তথ্যই অনুমান নির্ভর। তবে একথা সত্য যে, মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত ক্রমশই বেড়েই চলছে। শেরপুর পাহাড়ি এলাকায় ২০১০ থেকে ২৬ সাল পর্যন্ত ৪৭জন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে। বাংলাদেশে হাতি ও মানুষের আবাসস্থল নিয়ে সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুনো হাতির আক্রমণে শস্য, খাদ্য গুদাম ও সম্পদের ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার জো নেই। আবার হাতির আবাসস্থল, খাদ্য, বিচরণ ক্ষেত্র, করিডোর ইত্যাদি মানুষেরা দখল করেছে একথা কিন্তু সঠিক। যে কারণে হাতির আত্মপ্রজনন এবং সংখ্যা উভয়ই হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ। একথা দৃঢ়ভাবে বলা যায় মানুষই এর জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী।
হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত কেন? এ বিষয়টি সুশীলসমাজ ভেবে দেখেছেন কি? অথবা এর কোন বাস্তব সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সহজ উত্তর হচ্ছে –না! সমপ্রতি এটলাস (এলিফ্যান্ট রুট এ্যান্ড করিডর ইন বাংলাদেশ) শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায় যে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি চলাচলের ১২ টি করিডর আছে। যার অধিকাংশ কক্সবাজার রাঙ্গুনিয়া রাঙ্গামাটি তথা চট্টগ্রামের বৃহত্তর অঞ্চল। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশেপাশে উখিয়া ধুমধুম করিডর সম্পূর্ণ বন্ধ। আবার রেলপথ ও সেনা নিবাসের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে রামু উপজেলার তুলাবাগান পানের ছড়া করিডর। এটালাস আরো জানায় যে, ভারত বার্মা সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি সংলগ্ন দুটি আন্তর্জাতিক করিডর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। শেরপুর জামালপুর ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা মৌলভবাজার সংলগ্ন সীমান্তে এখনো আন্তসীমান্ত পরিযায়ী হাতির চলাচল অব্যাহত আছে। ফসলের মৌসুমে এই সকল রুটে ভারতীয় হাতিগুলো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষেতের শস্য খেয়ে ধ্বংস করছে। এখানে উল্লেখযোগ্য হাতি যে পরিমাণ খায় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি নষ্ট করে। বর্ষা মৌসুম পাহাড়ে প্রচুর গাছপালা জন্মে। তখন তাদের খাদ্যের অভাব হয় না। গ্রীষ্ম মৌসুমে পাহাড়ের জঙ্গলে খাদ্যের প্রচুর অভাব। বিশাল দেহি প্রাণীর খাদ্য চাহিদাও অনেক। যেহেতু পাহাড়ের জমি বনবাদর মানুষেরা দখল করে আছে। সেহেতু তারা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এখানেই হাতি এবং মানুষের মধ্যে সংঘাত বাধে।এক সময় তারা এক বন থেকে অন্য বনে চলাচল করে, খাদ্য সংগ্রহ করত। এই করিডোর সমূহ কোনো না কোনো ভাবে এখন মানুষের দখলে। হাতি চলাচলের সুযোগ কমে যায়। হাতি বিলুপ্তি রক্ষার জন্য সমস্যার সমাধান জরুরি ।
এটলাসের গবেষণায় সারাদেশে বন বিভাগের নয়টি বিভাগীয় বন এলাকায় ৪৪টি রেঞ্জে হাতির উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্ব এখন সংরক্ষণে মনোযোগী হয়েছে। সামপ্রতিক তথ্যে দেখা যায় চীনে হাতি লুপ্ত হয়ে ১৫০ টিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা সংরক্ষণের ফলে তার সংখ্যা এখন ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের অস্তিত্ব সংকটে থাকা বুনো হাতিগুলি কি আমরা সংরক্ষণ করতে পারব না? বন বিভাগ সমপ্রতি হাতির জরিপে মনোযোগী হয়েছে। পাশাপাশি তাদের উচিত সংরক্ষণের কাজে চালিয়ে যাওয়া। আমরা মনে করি হাতি ও মানুষের সহাবস্থানে আমাদের প্রকৃতির এই বিশাল দেহি প্রাণীগুলো রক্ষা পাবে। আসুন জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা মনোযোগী হই। অন্যথায় প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে ভুল করবে না। সামপ্রতিক নেপালের শোকাবহ ও বেদনাদায়ক ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, পরিবেশবিষয়ক গবেষক।











