শিশুশিক্ষার অগ্রগতি : কয়েকটি প্রস্তাবনা

জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া | বুধবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বজুড়ে শিশুশিক্ষার ওপর বিভিন্ন পদ্ধতি দেখা যায় যা সেই দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। মূলত প্রত্যেক দেশের সাধারণ লক্ষ্য একটি, শিশুদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করা এবং তাদেরকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা তাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শিশুদের প্রস্তুত করতে সহায়ক হয়। বিশ্বে ফিনল্যান্ড, জাপান ও সুইডেনের মতো উন্নত দেশগুলো শিশুউপযোগী শিক্ষার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে চলমান শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তারা যেন সঠিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতা নিয়ে গড়ে উঠে এবং বাস্তব জীবনে তা বিকাশ ঘটাতে পারে।

প্রশ্ন, আমরা কীভাবে শিশুশিক্ষাকে শিশুবান্ধব করব। মুখস্থ করে শেখা নাকি দেখে দেখে শেখার ওপর জোর দেব। পাঠদান করার ক্ষেত্রে শিশুর বয়স, সামর্থ্য, অভিরুচি ইতাদি বিবেচনায় রেখে পাঠাদান করতে হবে শিক্ষককে। হ্যান্ডস অন লার্নিং পদ্ধতির শিক্ষা সাধারণত শিশুরা কাজ করার মাধ্যমে বা হাতেকলমে শেখার একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল শুনে বা মুখস্থ করে না, বরং সরাসরি কোন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে জ্ঞান অর্জন করে। এটি সক্রিয় শিক্ষা বা অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষার একটি বাস্তবমুখী পরীক্ষিত রূপ। শ্রেণীকক্ষের বাইরে দেখে শেখা (অবজারভেশনবেজড লার্নিং) শিশুরা তাদের পরিবার, সমাজ ও আশেপাশের ব্যক্তিরা কীভাবে আচরণ করেন, তা থেকে ও শিখতে পারে। দেখা যায় শিশুরা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সেই পরিবেশের আচরণগুলো তাদের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। দুর্নীতি, অসততা ও নেতিবাচক আচরণ পরিবারে শিশুদের সামনে যখন প্রদর্শিত হয়, তখন তারা সহজেই সেটিকে গ্রহণ করে এবং তা সেটাকে সঠিক বলে মনে করতে শুরু করে।

ইংল্যান্ডে ও শিশুদের হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে দেখে দেখে শেখা, হাতেকলমে শেখা এবং প্রকৃতির মধ্যে শিখতে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে শিশুদেরকে স্বাধীন চিন্তা করতে এবং সৃজনশীল হতে উৎসাহিত করে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধান বৈশিষ্ট্য শ্রেণিকক্ষের বাহিরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিখতে পারে এবং তারা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী শেখার বিষয় বেচে নিতে পারে। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমানভাবে কার্যকর। সেখানে শিশুদের প্রাথমিকভাবে শিষ্টাচার, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সম্মানের বিষয়গুলো শেখানো হয়। নৈতিক শিক্ষা জাপানের স্কুলগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সুইডেনের শিক্ষাব্যবস্থা ফিনল্যান্ডের মতোই। শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ কম এবং স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতা বিকাশের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুরা প্রকৃতির মধ্যে শিখতে পারে, খেলাধুলা, প্রকৃতির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সমন্বিতভাবে ঘটে। শিক্ষাব্যবস্থায় আরেকটি বিশেষত্ব হলো শিশুদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা।

বাংলাদেশে এটি কার্যকর হতে পারে। যেখানে এখনো শিক্ষাব্যবস্থা সনদ ও পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল রয়েছে। মুখস্থ শেখা একটি প্রচলিত পদ্ধতি। শিক্ষার্থীরা ও তত্ত্বগত বিষয়গুলো মুখস্থ করতে বাধ্য হয়। শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরীক্ষাভীতি ও সনদনির্ভরতা।

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজব্যবস্থায় দুর্নীতি অসততা ও নৈতিক অবক্ষয় একটি বড় সমস্যা। শিশুদের চারপাশের পরিবেশ যখন দুর্নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন তারা ও সেই নেতিবাচক শিক্ষার পরিবেশে আক্রান্ত হয়।

ফিনল্যান্ড, জাপান, সুইডেন ও ইংল্যান্ড হতে পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি উদাহরণ। শিক্ষাকে একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে শিশুদের মননশীলতা, সৃজনশীলতা, সামাজিক মুল্যবোধ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সমন্বয় করে শেখানো দরকার। শিশুশিক্ষার উন্নয়নে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে শিশুর বয়স, সার্মথ্য, অভিরুচি ইত্যাদি বিবেচনা করে বাস্তবমুখী একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশে শিশু শিক্ষা উপযোগী কয়েকটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা যায় :

. নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব: শিশুরা যাতে সৎ,আদর্শবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষা এবং নৈতিক শিক্ষার উপর আর ও অধিক জোর দিতে হবে। ২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন: শিশুদেরকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করে গড়ে তুলতে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে। ৩. প্রকৃতি ও খেলাধুলার মাধ্যমে শেখা: শিশুদেরকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ করে দিতে পারলেই শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়ক হবে। ৪. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নঃ শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠদান নয়, তারা এক একজন মেন্টর। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান আরও উন্নত করতে হবে। শিক্ষকেরা যদি নৈতিক শিক্ষা এবং সৃজনশীল শিক্ষার পদ্ধতি জানেন, তবে তারা শিশুদের প্রকৃত শিক্ষা দিতে সক্ষম হবেন।

পরিশেষে বলতে চাই, যাঁরা এই শিক্ষাদানের কারিগর বা শিক্ষক তাদের যদি নৈতিকতা এবং শিক্ষাদানের মৌলিক তত্ত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকে তাহলে সঠিক শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীর বয়স, সামর্থ্য অভিরুচি বিবেচনা করে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদেরকে প্রতিদিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তখনই শিশুরা সত্যিকার, সুষ্ঠু ও সঠিক শিক্ষা পাবে।

লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৈনিক আজাদী ও ইঞ্জিনিয়ার খালেক
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে