১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছিলো আজাদী, তা আজ ছয় দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। দুই আনা বা ১২ পয়সা দামের ক্রাউন সাইজে প্রকাশিত সেই দিনের দৈনিক আজাদী সগৌরবে পদার্পণ করছে ৬৭ বছরে। চট্টগ্রামের মানুষের একটি নিজস্ব কণ্ঠস্বর প্রয়োজন সেই প্রয়োজন থেকেই দৈনিক আজাদীর জন্ম। হাজারো সংবাদ মাধ্যমের ভিড়ে এবং বাংলাদেশের অনেক জাতীয় পত্রিকারগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে দৈনিক আজাদী এখন চট্টগ্রামে সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা। যেহেতু সংবাদ মাধ্যমে আজাদী চট্টগ্রামকে প্রতিনিধিত্ব করছে তাই আজাদী চট্টগ্রামবাসীর মুখপত্র হিসেবে কাজ করছে। কালের পরিক্রমায় আজাদীর পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তন এসেছে প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক এর পর এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন অধ্যাপক অদ্যাপক খালেদ, বর্তমানে তারই ধারাবাহিকতায় শ্রদ্ধাভাজন এম এ মালেক দৈনিক আজাদীর সম্পাদক হিসেবে আজাদীকে আরো এগিয়ে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের মানুষের একটি আধুনিক সংবাদপত্র প্রয়োজন সেটি আজাদী এক কথায় বলতে গেলে পূরণ করেছে। আজাদী শুধু চট্টগ্রামের একটি সংবাদপত্র নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিক দলিল।
সকলের মত একজন পাঠক হিসেবে আমার সাথে দৈনিক আজাদীর প্রথম পরিচয় সেই শৈশবে। জাতীয় পত্রিকার পাশাপাশি কয়েকটি আঞ্চলিক পত্রিকা তখন চট্টগ্রামে প্রকাশিত হতো, তার মধ্যে পত্রিকার মান, প্রচ্ছদ, প্রিন্টিং এবং তথ্য বহুল সংবাদ প্রচারে আজাদীর সাথে অন্যদের মান ছিলো যোজন যোজন দূর। তাই স্বাভাবিকভাবে অনেকের মত সকালের প্রথম সংবাদপত্র হিসেবে আজাদীই ছিল আমার প্রথম পছন্দ। সময়ের পরিক্রমায় আজাদী হয়েছে অনেক সমৃদ্ধ এবং আরো বেশি উজ্জ্বল। পাঠক থেকে এখন আমি দৈনিক আজাদীর একজন নিয়মিত লেখক, তাই আজাদীকে এখন আমি বলি আমার আজাদী। শুধু তাই নয় আজাদী এখন আমার প্রাত্যহিক জীবনের একটি অংশ–এখন আমার সকালটা শুরু হয় আজাদী পড়ে। লেখক হিসেবে আমার সাথে আজাদীর পাঠক, সংবাদকর্মী এবং অন্যান্য লেখকের সাথে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাই আজাদী এখন আমার বললে খুব বেশি বলা হবে না।
দৈনিক আজাদী শুধু একটি সংবাদপত্র হিসেবে নয়, চট্টগ্রামের মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষা, চট্টগ্রামের মানুষের কথা তুলে ধরার জন্য একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পরে বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও বাস্তব অর্থে তার কোন পরিস্ফুটন নেই, তাই চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে। এই পিছিয়ে থাকার বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আজাদী চট্টগ্রামের গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে কাজ করছে, তাই আজাদীকে বলতে হয় আমাদের আজাদী। এ অঞ্চলের কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের লেখা প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকাটি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে করেছে সমৃদ্ধ। আজাদী চট্টগ্রামে সাংবাদিকতাকে শুধু একটি শক্তিশালী পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি সৃষ্টি করেছে বহু সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট, ফিচার লেখক ও সংবাদকর্মীর।
দৈনিক আজাদীর ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি বিশেষ অধ্যায়, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অধিকাংশ দৈনিক যখন প্রকাশিত হচ্ছে না। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পরদিন ১৭ই ডিসেম্বর ‘জয় বাংলা– বাংলার জয়’ শিরোনামে প্রকাশিত সংখ্যাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতিবাহক সংখ্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে আজ। শুধু তাই নয় এ সংখ্যাটি দৈনিক আজাদীর ইতিহাসকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে গেলে দৈনিক আজাদীকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। দৈনিক আজাদী একটি সংবাদপত্রের নামের চেয়েও বেশি এটি চট্টগ্রামের গণমানুষের ইতিহাসের দলিল। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পত্রিকা শুধু খবর প্রকাশ করেনি–চট্টগ্রামের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনেরও সাক্ষী হয়ে থেকেছে, প্রতিটি মুহূর্তে বলছে চট্টগ্রামের কথা। তাই এককথায় বলতে হয় চট্টগ্রাম এবং আজাদী যেন একই সূতায় গাঁথা।
ডিজিটাল যুগে সংবাদপত্রের সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তারের মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৈনিক আজাদীও পরিবর্তিত হয়েছে। তাই প্রতিযোগিতাশীল এই বিশ্বে তথ্য প্রযুক্তির যুগে আজাদী শুধু প্রিন্ট ভার্সন নয় অনলাইন ভার্সনের মাধ্যমে পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে, আজাদী এখন শুধু চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; প্রবাসী বাংলাদেশিরাও চট্টগ্রামের খবর সহজে জানতে পারে আজাদীর অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে। আজাদী চট্টগ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ।
লেখক, পাঠক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে আজাদী নতুনদের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে সৃষ্টি করবে সৃজনশীল লেখক। আজাদী বলবে আমাদের কথা, চট্টগ্রামের কথা। প্রতিনিয়ত সংযুক্ত করবে পাঠক চাহিদা নির্ভর বিভিন্ন পাতা। প্রত্যাশা থাকবে নতুন বিভাগের মত আজাদীর একটি ইংরেজি অনলাইন ভার্সনও যাতে চালু হয়। তাহলে শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে নয় বিদেশীদের কাছেও দৈনিক আজাদী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত হবে। আজাদী শুধু নিজেদের কথা বলছে না, আজাদী বলছে পাঠকের কথা, আজাদী বলছে লেখকের কথা, সর্বোপরি আজাদী বলছে চট্টগ্রামের কথা, আমাদের কথা। ৬৭ বছরে পদার্পণে আমাদের প্রত্যাশা দিন দিন আজাদী হোক আরো বেশি সমৃদ্ধশালী।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ












