কিছু কিছু স্মৃতি মানুষ চাইলেও ভুলতে পারে না। সময়ের সঙ্গে জীবনে অনেক কিছু বদলে যায়, মানুষ বদলায়, চারপাশ বদলায়, কিন্তু শৈশবের কিছু দৃশ্য মনের মধ্যে ঠিক আগের মতোই থেকে যায়। আমারও তেমন একটি স্মৃতি আছে, আর সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পত্রিকার নাম, ‘দৈনিক আজাদী’।
নব্বইয়ের দশকের চট্টগ্রাম। আমাদের বাসায় তখনকার দিনের মতোই সকাল শুরু হতো খবরের কাগজ দিয়ে। ভোরে সংবাদবাহকের সাইকেলের বেলের শব্দ শুনলেই বুঝতাম, আজাদী এসে গেছে। দরজার নিচ দিয়ে কাগজটা ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। একটু পর দাদু সেটি হাতে নিয়ে বসতেন। চায়ের কাপ পাশে, চোখে চশমা, আর সামনে মেলে ধরা আজাদী।
আমি তখন খুব ছোট। খবরের কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু দাদুর হাতে পত্রিকাটা দেখলেই পাশে গিয়ে বসতাম। বড় বড় অক্ষরের শিরোনামগুলো আমার খুব ভালো লাগত। ছবি দেখতাম, অক্ষর দেখতাম, আর দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার অক্ষর চেনার গল্পটা সেখান থেকেই শুরু।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই দাদু আজাদীর প্রথম পাতার বড় বড় শিরোনাম দেখিয়ে আমাকে বর্ণ চিনতে শেখাতেন। চশমাটা একটু নিচে নামিয়ে পত্রিকার পাতার দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘দাদুভাই, দেখো তো, এটা কোন বর্ণ?’ আমি কখনো ঠিক বলতাম, কখনো ভুল করতাম। দাদু আবার বুঝিয়ে দিতেন। ‘এটা অ’, ‘এটা আ’, ‘এটা ক’। আমি আঙুল দিয়ে অক্ষরগুলো অনুসরণ করতাম। কখনো একই অক্ষর বারবার দেখে মনে রাখার চেষ্টা করতাম।
আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, আমার প্রথম বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে একটি সংবাদপত্রও জড়িয়ে আছে। বই হাতে নেওয়ার আগেই পত্রিকার শিরোনাম আমার কাছে অক্ষর চেনার এক মজার জগৎ হয়ে উঠেছিল।
তাই আজাদীকে আমি শুধু একটি সংবাদপত্র হিসেবে দেখি না। আমার কাছে এর সঙ্গে শৈশবের একটা সম্পর্ক আছে। দাদুর একটা সম্পর্ক আছে। আর আছে আমার অক্ষর চেনার প্রথম স্মৃতি।
সকালের নাশতার সময় দাদু আজাদী পড়তেন। আমি পাশে বসে থাকতাম। কখনো ছবি দেখতাম, কখনো বড় অক্ষর পড়ার চেষ্টা করতাম। দাদু প্রথম পাতা থেকে শুরু করে পত্রিকার বিভিন্ন পাতা পড়তেন। সম্পাদকীয়, সাহিত্য পাতা, খেলাধুলা, চাটগাঁইয়া ভাষার লেখা, সবকিছুতেই তাঁর আগ্রহ ছিল।
ধীরে ধীরে আমিও পত্রিকাটা পড়ার চেষ্টা শুরু করি। প্রথমে শুধু বড় বড় শিরোনাম। তারপর ছোট ছোট শব্দ।
এখনকার সময়টা সম্পূর্ণ আলাদা। মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডেই খবর পাওয়া যায়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে চোখের সামনে চলে আসে। তারপরও কাগজ হাতে নিয়ে খবর পড়ার যে আলাদা একটা অনুভূতি, আমার কাছে সেটি এখনও আছে। বিশেষ করে আজাদীর কথা এলে সেই অনুভূতির সঙ্গে দাদুর স্মৃতিটাও চলে আসে।
চট্টগ্রামের সঙ্গে আজাদীর সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। আমার জন্মের অনেক আগে থেকেই এই পত্রিকা চট্টগ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। ১৯৬০ সালে আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারের হাত ধরে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও অব্যাহত রয়েছে।
একটি পত্রিকা দীর্ঘ ৬৬ বছর টিকে থাকা সহজ বিষয় নয়। এর পেছনে অনেক মানুষের শ্রম, সময় ও ভালোবাসা থাকে। আজাদীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মরহুম সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, বর্তমান সম্পাদক এম এ মালেক, পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেকসহ বিভিন্ন সময়ে যাঁরা এই পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের অবদান আজাদীর দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চট্টগ্রামের মানুষের সুখ–দুঃখ, আন্দোলন–সংগ্রাম, দাবি–দাওয়া, সাফল্য ও নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে আজাদী বছরের পর বছর পথ চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই পত্রিকার ভূমিকা চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে আজাদীকে শুধু খবরের কাগজ বললে হয়তো এর সঙ্গে চট্টগ্রামের মানুষের সম্পর্কটা পুরোপুরি বলা হয় না। আমার কাছে সেই সম্পর্কের আরেকটি ব্যক্তিগত অর্থ আছে। যে পত্রিকার প্রথম পাতার বড় বড় অক্ষর দেখে দাদুর কাছে বর্ণ চিনেছিলাম, একসময় সেই পত্রিকার পাতাতেই আমার নিজের লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করল। প্রথম দিকে যখন নিজের লেখা আজাদীতে ছাপা হতে দেখতাম, তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতো। পত্রিকাটা হাতে নিয়ে নিজের নামটা খুঁজতাম। লেখা খুঁজতাম। নামের নিচে নিজের পরিচয় দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতাম। ভাবতাম, এই সেই আজাদী, যার পাতা দেখে ছোটবেলায় আমি অক্ষর চিনেছিলাম!
জীবনের কিছু আনন্দ আসলে কাউকে ঠিক করে বোঝানো যায় না। নিজের লেখা কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া হয়তো একজন লেখকের জন্য স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু সেই পত্রিকার সঙ্গে যদি আপনার শৈশব জড়িয়ে থাকে, তাহলে অনুভূতিটা অন্যরকম হয়। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। কখনো কবিতা, কখনো কলাম, কখনো নিবন্ধ, বিভিন্ন সময়ে আজাদীর পাতায় আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবার নিজের নামটা দেখলে শৈশবের সেই সকালগুলোর কথা মনে পড়ে। দাদুর পাশে বসে পত্রিকার বড় বড় অক্ষর দেখার কথা মনে পড়ে। আর মনে হয়, দাদু যদি আজ থাকতেন, তাঁকে হয়তো পত্রিকাটা দেখিয়ে বলতাম, ‘দাদু, দেখো, তোমার সেই দাদুভাইয়ের লেখা আজাদীতে ছাপা হয়েছে।’ এই কথাটা ভাবলেই মনটা কেমন করে ওঠে।
আমার লেখা যখন চট্টগ্রাম শহর ছাড়িয়ে হাটহাজারী, পটিয়া, রাউজান, চন্দনাইশ, বাঁশখালী কিংবা পার্বত্য এলাকার পাঠকের কাছেও পৌঁছে যায়, তখন ভালো লাগে। পরিচিত কেউ ফোন করে বা দেখা হলে বলে, ‘আপনার লেখাটা আজাদীতে পড়েছি।’ একজন লেখক হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের মুহূর্ত খুব বেশি নয়। তবে এই আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বও আছে। কারণ পাঠকের হাতে যখন লেখা পৌঁছে যায়, তখন লেখকের নিজের কথার প্রতি আরও সচেতন হতে হয়। আজাদীর মতো দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি পত্রিকায় লেখার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে তাই শুধু আনন্দের নয়, সম্মানেরও।
৬৬ বছর ধরে আজাদী চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে পথ চলছে। এই দীর্ঘ পথচলায় কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে, কত প্রজন্ম বড় হয়েছে, তার হিসাব করা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি, তা হলো মানুষের সঙ্গে এই পত্রিকার সম্পর্ক। এই বিশেষ দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদসহ এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সকল সাংবাদিক, লেখক, কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের। তাঁদের শ্রম ও নিষ্ঠার কারণেই আজাদী এত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে।
দৈনিক আজাদী আরও বহু বছর চট্টগ্রাামের মানুষের কথা বলুক, মানুষের পাশে থাকুক। নতুন প্রজন্মের কেউ আবার তার পাতায় অক্ষর চিনুক, কেউ পাঠক হোক, কেউ লেখক হয়ে ফিরে আসুক। আর আমার মতো কোনো এক পাঠক–লেখক হয়তো একদিন আবার নিজের নামটি আজাদীর পাতায় দেখে মনে মনে বলবে, ‘এই পত্রিকার পাতাতেই তো আমার অক্ষর চেনার শুরু।’
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক












