একটি স্বপ্ন কখনো শুধু একজনের থাকে না। একজন শিক্ষার্থী যখন বই হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে হাঁটেন, তার চোখে থাকে নিজের ভবিষ্যৎ, পরিবারের প্রত্যাশা এবং দেশকে কিছু দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই স্বপ্নের পথে কখনো একটি স্বীকৃতি হয়ে ওঠে বড় প্রেরণা, কখনো সামান্য একটি সহায়তাই জোগায় অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সাহস। মেধার সেই স্বীকৃতি ও স্বপ্নের সেই প্রেরণা নিয়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক আজাদী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ১০ মেধাবী শিক্ষার্থী পেয়েছেন ‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক–দৈনিক আজাদী শিক্ষাবৃত্তি’। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে তাদের এ বৃত্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়। গতকাল বুধবার দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নির্বাচিত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে বৃত্তির অর্থ তুলে দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে ‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক–দৈনিক আজাদী শিক্ষাবৃত্তি’ চালু করা হয়।
বৃত্তির অর্থ হাতে নেওয়ার মুহূর্তটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের, গর্বের এবং আবেগের। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান যখন বললেন, টাকার অংকে বৃত্তি মাপা যাবে না। আপনারা স্কলারশিপ পেয়েছেন এটিই বড় কথা। এটিই গৌরব এবং সম্মানের। তিনি বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান, পরিবারের সম্মান, দৈনিক আজাদী যে তাদের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ালো তার মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানান।
বৃত্তি প্রদান করায় দৈনিক আজাদী কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমি মনে করি যে আজকের দিনটা একটা আনন্দঘন দিন। আমাদের নতুন প্রশাসনের জন্য আনন্দের দিন। আমি বলতে পারবো যে আমার শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়েছে। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র–ছাত্রীদের হাতে এই বৃত্তির টাকার যে সম্মান, এর চেয়ে আর বড় কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
স্কলারশিপের আর্থিক ভিত্তি তুলে ধরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, দৈনিক আজাদীর এই মানবিক উদ্যোগের জন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষার্থী এবং চাকসুর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই উদ্যোগের প্রতি থাকলো আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা। তিনি বলেন, এফডিআর এর ভ্যালু বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা আস্তে আস্তে আরো বাড়বে এবং সামনের বছর দেখা যাবে যে এই ভ্যালুটা আরও অনেক বেড়ে যাবে। লভ্যাংশের পরিমাণ যত বাড়বে, ভ্যালুটাও তত বেড়ে যাবে। আমরা তত বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিতে পারবো। উপাচার্য বলেন, এটি কেবল কিছু অর্থ প্রদান নয়। এটি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের অর্জিত মেধার স্বীকৃতি। তাদের পরিশ্রম, তাদের সাফল্য মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের মানুষের কোনো অভাব নাই, কিন্তু ভালো মানুষের অভাব আছে। তাঁর এই কথায় যেন বৃত্তি প্রদানের মূল দর্শনটিই উঠে আসে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ হন না, শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় অর্জন বলেও এম এ মালেক মন্তব্য করেন।
শিক্ষার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার সাথে সাথে আমাদেরকে সবকিছু আস্তে আস্তে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের এখানে মানুষের কোনো অভাব নাই, কিন্তু ভালো মানুষের অভাব আছে। শিক্ষা আমাদেরকে ভালো মানুষ করবার জন্য সহায়তা করে।
প্রখ্যাত মনিষীদের উদ্বৃতি দিয়ে এম এ মালেক বলেন, শিক্ষা এমন একটি অস্ত্র, যা দিয়ে পৃথিবী পাল্টে দেয়া যায়। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। শিক্ষার্থীদের বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত করে এম এ মালেক বলেন, একটা বই ভালো বন্ধুর সমান। আবার একজন ভালো বন্ধু একটা লাইব্রেরির সমতুল্য। সুতরাং বই যদি না পড়ি, তাহলে কিন্তু জানতে পারবো না। যত বেশি জানতে পারবো, ততই আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শুধু ভালো ফলাফল করার সময় নয়, এই সময় নিজেকে গড়ে তোলার সময়। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন আজকের এসব শিক্ষার্থী।
‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক–দৈনিক আজাদী শিক্ষাবৃত্তি’র পরিধি বাড়ানোর কথাও জানান দৈনিক আজাদী সম্পাদক। তিনি বলেন, শুধু ফার্স্ট–সেকেন্ড না, যারা ফাইন্যানশিয়ালি একটু কম সুবিধাপ্রাপ্ত, তাদের দিকে হাত বাড়ানোর জন্য, তাদের একটু সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আমরা এফডিআরের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা করে দেবো। এর একটি অংশ মেধাবীদের এবং একটি অংশ আর্থিক কষ্টে থাকা শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, দৈনিক আজাদী শুধু বৃত্তি দিচ্ছে না, আমরা কিছু তরুণ মেধাবীর স্বপ্ন পূরণের সাথী হচ্ছি। কিছু সুবিধাবঞ্চিত স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর পিঠে হাত রাখছি।
এবারের বৃত্তিপ্রাপ্ত ১০ শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছে তাদের মেধার ভিত্তিতে, আগামী বছর থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদেরও বৃত্তির আওতায় আনা হবে।
একটি বৃত্তি হয়তো একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন বদলে দেয় না, তবে তার মেধাকে যখন স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন বদলে যেতে পারে তার আত্মবিশ্বাস। তার মনে জন্ম নিতে পারে আরও বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা। সে যখন বুঝতে পারে তার পরিশ্রম বৃথা যায়নি, তার স্বপ্নের মূল্য আছে, তখন সে আরো বড় কিছু করার প্রস্তুতি নেয়। দৈনিক আজাদী শিক্ষার্থীদের সে বড় কিছু করার স্বপ্নটাকে জাগিয়ে দিতে চায়।
দৈনিক আজাদীর কাছে এই বৃত্তি তাই নিছক একটি শিক্ষাবৃত্তি নয়। এটি মেধাকে সম্মান জানানোর একটি অঙ্গীকার। তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে এবং সেই স্বপ্নের পথে তাদের আরও একধাপ এগিয়ে দিতে পাশে থাকার এক মানবিক প্রয়াস।
আজকের এই ১০ মেধাবী শিক্ষার্থী হয়তো একদিন দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বেন। কেউ বড় বিজ্ঞানী, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ আইনজীবী, কেউ সাংবাদিক কিংবা অন্য কোনো পেশায় নিজের পরিচয় তৈরি করবেন। তখন হয়তো তাদের মনে পড়বে–বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনটির কথা, যেদিন তাদের মেধার স্বীকৃতি হিসেবে হাতে উঠেছিল ‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকু–দৈনিক আজাদী শিক্ষাবৃত্তি’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দৈনিক আজাদীর সম্পর্ক যে কেবল সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে এই বৃত্তি। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত দৈনিক আজাদী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন নিপু অনুষ্ঠানে সেই সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা বিভাগ যখন যাত্রা শুরু করল, সাংবাদিকতা বিভাগের একেবারে সিলেবাস প্রণয়ন থেকে শুরু করে কমিটি অব কোর্স থেকে শুরু করে সবকিছুর সাথে দৈনিক আজাদী আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল।
শিক্ষার্থীদের হাতে–কলমে সাংবাদিকতা শেখার সুযোগ তৈরিতে আজাদীর সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, আমাদের স্টুডেন্টদের বিভিন্ন হাউসগুলোতে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে হাতে–কলমে কাজ শেখার যে সুযোগগুলো, আজাদী আমাদেরকে বরাবরই করে দিয়ে আসছে।
এবারের বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মো. তারিকুল ইসলাম ও উম্মে সালমা সামিয়া, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ থেকে আরবি বিভাগের আবুল হাসান মোহাম্মদ রিয়াদ, বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের সানজানা শাহীন অপি এবং ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ থেকে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের সানজিদা সিদ্দিকা। এছাড়া আইন অনুষদ থেকে আইন বিভাগের মারজানা ইসলাম, জীববিজ্ঞান অনুষদ থেকে ফার্মেসি বিভাগের তাহমিনা হক নুহা, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তানভিউল শরাফ অভি, শিক্ষা অনুষদ থেকে ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের মো. আশরাফুল আলম মজুমদার মেহেদী এবং মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদ থেকে ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের তাসনিম রহমান রিমু বৃত্তি পেয়েছেন।
বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের এই ১০ শিক্ষার্থীর পথ আলাদা, স্বপ্নও আলাদা। কেউ মানুষের কথা বলবেন কলমে, কেউ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলবেন, কেউ আইন ও ন্যায়বিচারের পথে কাজ করবেন, কেউ প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবেন, কেউ সমুদ্র ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু তাদের সবার পথের শুরু একই জায়গায়–মেধা, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের পথেই একটি ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকল ‘ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক–দৈনিক আজাদী শিক্ষাবৃত্তি’।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ–উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল–আমীন, উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন নিপু, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান হলের প্রভোস্ট এ জি এম নিয়াজ উদ্দিন, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. হাছান মিয়া, দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, সহযোগী সম্পাদক রাশেদ রউফ, চিফ রিপোর্টার হাসান আকবর, চাকসুর জিএস সাইদ বিন হাবিব, এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।












