চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা মাশুল পরিশোধে বড় ধরনের ডিজিটাল সুবিধা চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সঙ্গে এক লাখ টাকার কম অঙ্কের লেনদেনও বাংলাদেশ রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (বিডি–আরটিজিএস) ব্যবস্থায় সরাসরি পরিশোধ করা যাবে। এর ফলে পে–অর্ডার, চেক কিংবা একাধিক ছোট বিল একত্র করে পরিশোধের প্রয়োজন কমবে। দ্রুত অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় জাহাজ, কন্টেনার ও পণ্য খালাসের বিভিন্ন ধাপে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বন্দরের রাজস্ব আদায়ও আরও গতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট গত ১ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। পিএসডি–২ সার্কুলার নং–০৪ অনুযায়ী আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সমুদয় লেনদেনে বিডি–আরটিজিএস ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বনিম্ন এক লাখ টাকার সীমা আর প্রযোজ্য হবে না। বন্দরের ভেসেল বিল, কন্টেনার বিল, কনসাইনি বিলসহ অপারেশনাল সেবা–সংক্রান্ত সব ধরনের চার্জ পরিশোধে এ সুবিধা পাওয়া যাবে। নতুন ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট ট্রানজেকশন টাইপ কোড টিটিসি ০৪২ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বন্দরের নির্ধারিত সেবা মাশুল সরাসরি রিয়েল–টাইমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
এতদিন বিডি–আরটিজিএস ব্যবস্থায় অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা ছিল সর্বনিম্ন সীমা। ফলে এর চেয়ে কম অঙ্কের কোনো বিল বা মাশুল আরটিজিএসের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ ছিল না। বন্দর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সংকট তৈরি করতো বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বন্দরের বিভিন্ন সেবার বিপরীতে একাধিক ছোট অঙ্কের বিল তৈরি হয়। এসব বিল পরিশোধে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতো।
নতুন নির্দেশনায় সেই সীমাবদ্ধতা দূর হচ্ছে। ফলে এক লাখ টাকার নিচের বিলও তাৎক্ষণিকভাবে আরটিজিএসের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। বিশেষ করে শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, কন্টেনার অপারেটর ও অন্যান্য বন্দর ব্যবহারকারীরা এর সরাসরি সুবিধা পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অর্থ পরিশোধের গতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বন্দরের কোনো সেবার বিপরীতে মাশুল পরিশোধ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়া যায় না। ফলে পেমেন্ট নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে তার প্রভাব পড়ে পণ্য ডেলিভারি, কন্টেনার ছাড়করণ কিংবা জাহাজের বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সময়সূচিতে। আরটিজিএসের মাধ্যমে অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ থাকায় এ ধরনের বিলম্ব কমবে।
বিশেষ করে ছোট অঙ্কের বিল পরিশোধের জন্য আমদানিকারক বা শিপিং এজেন্টদের একাধিক বিল জমিয়ে একসঙ্গে পরিশোধ করার প্রয়োজন হবে না। ফলে বন্দরের সঙ্গে তাদের আর্থিক লেনদেন আরও ধারাবাহিক ও স্বয়ংক্রিয় হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সূত্র মন্তব্য করেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর ফলে ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) প্রক্রিয়া, কন্টেনার ছাড়করণ এবং জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানোর ক্ষেত্রে পরোক্ষ সুবিধা তৈরি হতে পারে। কারণ অর্থ পরিশোধের প্রমাণ ও নিষ্পত্তি দ্রুত নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থাপনা। নির্দিষ্ট কোড ব্যবহারের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব ব্যবস্থায় লেনদেন শনাক্তকরণ ও সমন্বয় সহজ হবে। বন্দরের অটোমেটেড বিলিং, রাজস্ব আদায় এবং পরবর্তী নিরীক্ষা কার্যক্রমেও এর সুফল পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কাগজভিত্তিক পেমেন্ট ডকুমেন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি অধিক সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে বন্দর।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জাহাজ, কনটেইনার ও পণ্য সংক্রান্ত সেবা এখানে সম্পন্ন হয়। এসব সেবার বিপরীতে বিভিন্ন পর্যায়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে মাশুল পরিশোধ করতে হয়। ফলে বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর জন্য অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হওয়া সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলবে বলেও বন্দরের কর্মকর্তারা জানান।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার এই উদ্যোগকে চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে যেখানে অটোমেশন ও পেপারলেস প্রক্রিয়া বাড়ছে, সেখানে রাজস্ব ও সেবা মাশুল পরিশোধের ক্ষেত্রেও রিয়েল–টাইম ডিজিটাল লেনদেন যুক্ত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সমন্বিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো বলে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম জানিয়েছেন।












