যত্রতত্র দেয়াল লিখন ও পোস্টার : আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ

মো. দিদারুল আলম | সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ at ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মহানগরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ গ্রাস করছে যত্রতত্র লাগানো অবৈধ পোস্টার, ব্যানার আর ফেস্টুন। নগরীর প্রধান সড়ক, ভেতরের অলিগলিকোথাও ফাঁকা নেই। সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গণপরিবহনের যাত্রী ছাউনি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এখন পোস্টারের নিচে চাপা পড়েছে। সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, পুরো চট্টগ্রাম শহর যেন এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই লাগামহীন পোস্টার সন্ত্রাস বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জিইসি মোড়, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, বহদ্দারহাট এবং আগ্রাবাদের মতো ব্যস্ততম এলাকার দৃশ্য সবচেয়ে শোচনীয়। বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা বার্তা, টুলেট এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে পুরো নগরী। একটির ওপর আরেকটি পোস্টার লাগানোর ফলে দেয়ালগুলোতে নোংরা স্তূপ তৈরি হয়েছে।

এ দৃশ্য শুধু ষোলশহর ২ নম্বর গেট নয়, শহরের সর্বত্র। রাজনৈতিক পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও। কোন ধরনের নিয়মনীতি না মেনে এসব লাগানো হয়েছে। যাতে করে নগরের সৌন্দর্যহানি ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। একই অবস্থা দেখা গেছে, বহদ্দারহাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ, নিউমার্কেট মোড়, কোতোয়ালী মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, নতুন ব্রিজ এলাকা, অক্সিজেন মোড়, প্রবর্তক মোড়, অলংকার মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার। পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন থেকে বাদ যায়নি জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও। রয়েছে সড়কের পাশেও।

এই পোস্টার সংস্কৃতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন নামীদামী কোচিং সেন্টার এবং নতুন গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। দেয়ালে চুনকাম বা রঙ করার কয়েকদিনের মধ্যেই রাতের আঁধারে এসব পোস্টার লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন দেয়ালের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে পথচারী ও পর্যটকদের কাছে চট্টগ্রাম শহরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কোথায় দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ? চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষএর। কিন্তু যত্রতত্র এই পোস্টার লাগানোর বিরুদ্ধে তাদের দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।

এসব ব্যানারে তাকালে কিছু বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়, যা দেখতে অনেক সময় অশোভনীয় লাগে। যেমন রংবেরঙের পোস্টার ও ব্যানারের ওপরে এক পাশে ছোট সাইজে দলীয় প্রধানের ছবি, আরেক পাশে শোভা পাচ্ছে স্থানীয় নেতার ছবি, তাও আবার এ ছবিও দেওয়া হয়েছে ছোট সাইজে। কিন্তু ব্যানার কিংবা পোস্টারে নিজের ছবিটা ডিজাইন করা হয়েছে বড় সাইজের। এসব এখন রাজনীতির মাঠে নতুন ট্রেন্ড। হালে যুক্ত হওয়া এ ট্রেন্ড গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ামহল্লার অলিগলিতে। সংগঠনের পদপদবিহীন কিংবা ছোট পদে আসীন নেতাকর্মীর মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। নগরবাসী রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন যুগের অবসান চায়। মূলত রাজনীতির মাঠে অবৈধ সুবিধা নিতে এ ধরনের পোস্টার, ফেস্টুনব্যানার টাঙাচ্ছে দলের সুবিধাবাদী কিছু নেতাকর্মী। দলের সিনিয়র নেতাদের ছবি ব্যবহার করে তারা পাড়ামহল্লা, অলিগলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রংবেরঙের পোস্টার, ফেস্টুনব্যানার টাঙিয়ে নিজের শক্তিশালী অবস্থার জানান দিচ্ছে। এরপর কেউ কেউ সাধারণ মানুষ থেকে নানা কৌশলে আদায় করছে চাঁদা। এতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশে যত্রতত্র পোস্টার বা ব্যানার লাগানো এবং দেয়ালে লেখার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এই অপরাধ দমনের জন্য দেশে ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ কার্যকর রয়েছে। এই আইনের মূল ধারা এবং শাস্তির বিধানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: মূল আইনি বিধিনিষেধঅনুমতি ছাড়া নিষেধাজ্ঞা: স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা বাড়ির মালিকের লিখিত অনুমতি ছাড়া সরকারি বা ব্যক্তিগত কোনো দেয়ালে, ভবনে, পিলারে বা গাছে পোস্টার লাগানো বা দেয়াল লিখন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। নির্ধারিত স্থানের বাইরে নিষিদ্ধ: সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত ‘পোস্টার জোন’ বা নির্দিষ্ট বোর্ড ছাড়া অন্য কোথাও কোনো প্রকার প্রচারসামগ্রী সাঁটানো যাবে না। শাস্তির বিধানএই আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নিয়ম অমান্য করে যত্রতত্র পোস্টার লাগায় বা দেয়াল লিখন করে, তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য যে শাস্তির বিধান রয়েছে:

চট্টগ্রাম মহানগরীকে পোস্টার ও ব্যানারের জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে দৃশ্যদূষণ ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে। চসিকের উদ্যোগে দেয়াল লিখন ও পোস্টার সাঁটানো নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অনুমোদনহীন বা অবৈধভাবে যারা ব্যানার ও পোস্টার লাগাবে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক মোটা অঙ্কের জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রচারণায় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের তৎপরতা বাড়িয়ে প্রতিদিন ভোরে নতুন লাগানো পোস্টার ও ব্যানারগুলো দ্রুত ছিঁড়ে ফেলার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে প্রচারকারীরা বুঝতে পারে যে এখানে পোস্টার লাগিয়ে কোনো লাভ হবে না।

এছাড়া শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা দেয়ালে যত্রতত্র পোস্টার না মেরে, চসিকের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে পোস্টার জোনবা আধুনিক নোটিশ বোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নিয়ম মেনে প্রচারণা চালানো যাবে। সর্বোপরি, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে কোনো আইনি পদক্ষেপই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাস্তবতায় পিষ্ট মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবন