নেপালে ৯টি পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে আছে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক

আকস্মিক বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৭৯৪, প্রধান শিক্ষকের বুদ্ধিতে বাঁচল ১৬৪৩ শিক্ষার্থী

| সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সবুজে ঢাকা পাহাড়ের পায়ের নীচে ছবির মতো বাড়ির সারি। সামনে সরু সুতোর মতো বয়ে চলেছে নদী। গত বুধবার ভোরেও এমনটাই ছিল নেপালতিব্বত সীমান্তের গ্রামগুলো। তার পরেই কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে বদলে যায় ছবিটাই। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যয় নেমে আসে দেশটিতে। পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর চারদিন অতিবাহিত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে ৫টা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ৭৯৪ জনে পৌঁছেছে বলে জানায় নেপাল পুলিশ। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে ৮ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল ভোটেকোশী নদীর পানি আবার বাড়তে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের নতুন করে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত যে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হয় তার মধ্যে শনাক্ত করা গিয়েছে মাত্র ২০টির। সেগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অশনাক্ত মরদেহ আর বেশি দিন সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে না নেপাল সরকার। তাই গণকবরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নির্দেশিকাও জারি করা হয়েছে।

ত্রিশূলী নদীর উপর বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। রাসুয়া এবং নুয়াকোট জেলা মিলিয়ে নদীতে মোট নয়টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। তার মধ্যে পাঁচটি এখনও নির্মীয়মাণ। আকস্মিক বন্যায় এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গমুখগুলি চাপা পড়ে যায় কাদামাটির স্তূপের নীচে। সুড়ঙ্গগুলিতে আটকা পড়ে আছে প্রায় ৯০০ শ্রমিক। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে সাড়ে তিনশর কিছু বেশি শ্রমিককে উদ্ধার করা গেলেও বাকিদের এখনো সন্ধান মেলেনি। অন্তত ৫৩৭ জন শ্রমিকের খবর মেলেনি। এদিকে রাসুয়ার স্যাপ্রুবেসিতে একটি ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছিল। উদ্ধারকারীরা প্রথমে ভেবেছিলেন বিড়াল ডাকছে। সেই ভেবে কাদামাটির স্তূপ এবং ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করেন তারা। তাতেই খোঁজ মেলে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর। তার নাম মণীষা। কাদামাটির স্তূপের নীচে দু’দিন ধরে আটকে থাকা মণীষাকে গত শুক্রবার উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে পাঠানো হয় কাঠমান্ডুর হাসপাতালে। আপাতত সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। দেখা হয়েছে বাবামায়ের সঙ্গেও।

অপর এক খবরে বলা হয়েছে, নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় এক স্কুলের প্রধানশিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে সেই দুর্যোগের সময় প্রাণে বাঁচে ১৬৪৩ শিক্ষার্থী। বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধানশিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদ্রি প্রথম সতর্কবার্তা পান। তখনও জানেন না, পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে কী হতে চলেছে। এক বন্ধু তাকে জানান, গোটা গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে রাক্ষুসে নদী। সে এখন স্কুলের দিকে ছুটে আসছে। দৌড়ে পালানো ছাড়া আর উপায় নেই। কিন্তু ত্রিশূলী উপত্যকায় রাজেন্দ্রের স্কুলটি নদী থেকে অনেকটা উঁচুতে। অন্তত ৬০ মিটার উঁচুতে কংক্রিটের স্কুলে বন্যা আঁচড় কাটতে পারবে বলে প্রথমে ভাবেননি রাজেন্দ্র। ভেবেছিলেন, স্কুলভবনটি বেঁচে যাবে। তখন তার স্কুলে ১৬৪৩ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। ঠিক সেই সময়েই ছুটতে ছুটতে স্কুলে আসেন এক অভিভাবক। জানান, নদীর জল খুব বেড়ে গিয়েছে। আরও বাড়ছে। যে কোনও মুহূর্তে তা স্কুলে চলে আসবে। এর পর আর দেরি করেননি রাজেন্দ্র। দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ঘণ্টা বাজিয়ে স্কুলের অন্য শিক্ষকদের ডাকেন এবং ক্লাসরুম খালি করার নির্দেশ দেন। স্কুলের বাস চালকদের ডেকে পাঠান এবং সকলকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। কেবল এক জন চালকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে পারেননি। দূর থেকে দেখতে পান, সেই বাসটি সেতু পার করছে। যে দিক থেকে বন্যা আসছে, বাসটি না জেনে সে দিকেই এগিয়ে গিয়েছিল। আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা বুঝে গিয়েছিল, ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে। এক ছাত্রীর প্যানিক অ্যাটাক হয়। তাকে মোটরসাইকেলে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন রাজেন্দ্র। তার পর সমস্ত শিক্ষার্থীকে নিয়ে ছুটতে শুরু করেন। আরও উঁচুতে একটি গাছের নীচে আশ্রয় নেন তারা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখেন, স্কুলবাড়িকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গর্জন করতে করতে ছুটে যাচ্ছে পানি আর কাদামাটির প্রবল স্রোত।

স্কুলের এক জন মাত্র শিক্ষককে বাঁচাতে পারেননি রাজেন্দ্র। তিনি পাশে নিজের বাড়িতে খাবার বানাতে গিয়েছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাঙামাটিতে উদ্ধার হিমালয়ান গন্ধগোকুল,ফিরল সংরক্ষিত বনে
পরবর্তী নিবন্ধচকবাজারে জাল নোট চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার