শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে নেপালে প্রাণে বাঁচল ১,৬৪৩ স্কুলপড়ুয়া

ডেস্ক নিউজ | রবিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৩৬ অপরাহ্ণ

শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধির জেরে নেপালে প্রাণে বাঁচল ১,৬৪৩ জন স্কুলপড়ুয়া। সেই শিক্ষক না থাকলে হয়তো মৃত বা নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়ত।

বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে বন্ধুর কাছ থেকে ফোনে সতর্কবার্তা পান নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াড়ি। সামনে তখন ভয়াবহ বিপদ। হিমবাহ ধসে পাহাড়ি নদীতে আচমকা নেমে এসেছে প্রবল জলস্রোত। আর সে সময় স্কুলের তিনতলা ভবনের আশপাশে ছিল ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

বন্যার সময় প্রথমে স্কুলটিকে নিরাপদই মনে হয়েছিল দাওয়াড়ির। কংক্রিটের তৈরি তিনতলা ভবনটি নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে। স্কুলটি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেটি গ্রামের সঙ্গে নদীর পূর্ব পাড়কে একটি স্টিলের সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করেছে। চারদিকে বন্যার খবর পেয়ে এক অভিভাবক ছুটে এসে দাওয়াড়িকে জানান, নদীর জল দ্রুত বাড়ছে।

একথা শুনে আর দেরি করেননি প্রধান শিক্ষক। স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ খালি করার নির্দেশ দেন। স্কুলবাসের চালকদেরও ফোন করে পড়ুয়াদের নিয়ে স্কুলে আসতে নিষেধ করেন। তবে একজন চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যেই দাওয়াড়ি দেখতে পান, সেই বাসটি সেতু পার হয়ে স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। ততক্ষণে পড়ুয়ারাও বুঝতে শুরু করেছে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। এরই মধ্যে এক ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে মোটরবাইকে করে দ্রুত উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাকিরা পায়ে হেঁটে নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করে। তাদের পেছনে ছিলেন দাওয়াড়িও।

শেষ পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীরা একটি বটগাছের নিচে আশ্রয় নেয়। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল জলের স্রোত স্কুলটিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বাঁচল ১,৬৪৩ পড়ুয়ার প্রাণ

দাওয়াড়ির নেওয়া সিদ্ধান্তের জেরে ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া প্রাণে বাঁচে। তবে স্কুলের দুই কর্মী আর ফিরতে পারেননি। ৩২ বছর বয়সী ইতিহাসের শিক্ষক সন্তোষ পারিয়ার বাড়ি গিয়েছিলেন রান্না করতে। তিনি আর ফিরে আসেননি। বাড়িসহ স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী সুলতান লামাও পড়ুয়াদের সরিয়ে নেওয়ার পর স্কুলের দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে প্রাণ হারান।

‘আমি আর কী করতে পারতাম?’

পড়ুয়াদের প্রাণ বাঁচানোর পর স্থানীয় বাসিন্দারা দাওয়াড়িকে নায়ক বলছেন। কিন্তু নিজেকে নায়ক মনে করছেন না তিনি। স্কুলের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সরল জবাব, ‘আমি আর কী করতে পারতাম?’

তবে তাঁর সেই কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্তই ১,৬৪৩টি প্রাণকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে।

নেপালে ভয়াবহ এই হড়পা বানে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৬ জন। নেপালে প্রায় ২,৪৯৮ জন এবং তিব্বতের গিয়রং কাউন্টিতে আরও ৫৪৬ জন এখনও নিখোঁজ বলে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানা গেছে।

কীভাবে হলো এই ভয়াবহ হড়পা বান?

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের একটি বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ভেঙে পড়ে। প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে লহেন্দে খোলা নদীর খাড়াই গিরিখাতে সেই বিশাল বরফ-পাথরের স্তূপ আছড়ে পড়ে।

এর ফলেই নদীতে আচমকা বিপুল জল, বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হয়। সেই প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক বাড়ি, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূ-রূপবিদ ড্যানিয়েল শুগারের হিসাব অনুযায়ী, ভেঙে পড়া বরফ-পাথরের বিশাল অংশটি প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে ছিল—যা লন্ডনের গ্রিন পার্কের প্রায় সমান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে নেক্সট লিডার্সের ফাউন্ডার্স গেট-টুগেদার