আত্মিক উন্নয়নের জন্য বই পড়া

লিপি বড়ুয়া | রবিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ

বই পড়া শুধু জ্ঞান আহরণের মাধ্যমই নয়, এটি মননশীলতা, কল্পনাশক্তি এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি ভালো বই আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়, জীবনের অর্থ বুঝতে সহায়তা করে এবং মনের ভেতরে আলো জ্বালায়। বই হলো জ্ঞান অর্জনের সেরা মাধ্যম। বই পড়লে আপনার মন শান্ত স্থির থাকবে কল্পনার জগৎ প্রসারিত হবে নিজেকে এক নতুন পৃথিবীতে আবিষ্কার করতে পারবেন। মনের জটিলতা অশান্তি দূর করতে বই পড়ার বিকল্প নেই। দিনে অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়ুন। হাতের কাছে একটি ভালো বই রাখুন। বই পড়ার জন্য একটি স্থান নির্বাচন করুন। শব্দবিহীন নীরব পরিবেশে বই পড়ার চেষ্টা করবেন। বই পড়ার অভ্যাস মনকে চাঙ্গা রাখে। মনকে স্থিতিশীল করে। একটা সময় ছিলো যখন বই পড়া বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো।এখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিনোদনের হাজারো মাধ্যমে রয়েছে যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান প্রজন্ম বই পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তারপরও একটা বিষয় বলতে হয়, তা হলো একটি ভালো বই আপনাকে যে পরিমাণ জ্ঞানশক্তি, মনের একাগ্রতা ও গভীর চিন্তাশক্তিতে সমৃদ্ধ করবে তা অন্য মাধ্যম থেকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যারা সাহিত্যচর্চায় রত আছেন তাদের জন্য বই পড়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বই পড়ার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান লেখার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান করে, ভাষার ওপর দখল ও লেখার হাত ভালো হয়। প্রমথ চৌধুরীর বিখ্যাত ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন যে, লাইব্রেরি হলো এক ধরনের হাসপাতাল, যেখানে মানুষ তার মনের রোগ মুক্তি ঘটাতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, পাস করা আর শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয় এবং সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। লেখক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে স্বশিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়া বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি লাইব্রেরিকে স্কুলকলেজের চেয়েও বেশি কার্যকরী বলেছেন। তাঁর মতে, মানুষের মনে আনন্দ ও রুচি গঠনে সাহিত্যচর্চা এবং স্বাধীনভাবে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। জোর করে নয় নিজের রুচি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বই পড়ুন। প্রতিদিনের কাজকর্মের তালিকায় একটি ভালো বই পড়ার অভ্যাসও যুক্ত করুন দেখবেন খুব ভালো থাকবেন।

বই হলো এমন এক বন্ধু যে কখনো আপনাকে একা রাখেনা। একটি ভালো বই পারে আপনার মনের ভেতরের আলো জ্বালাতে। একটি ভালো বই হাজারটি ভুবনের দুয়ার খুলে দেয়। বইয়ের পাতার শব্দে হারিয়ে যায় জীবনের সব ক্লান্তি। শব্দের ভাঁজে থাকে শান্তির খোঁজ। সাময়িক বিনোদন আপনাকে হয়তো চোখের শান্তি দেয় কিন্তু বই দেয় মনের ভেতরের গভীর এক প্রশান্তি। একজন প্রকৃত পাঠক মৃত্যুর আগে হাজারটি জীবন বাঁচে, আর যে বই পড়েনা সে কেবল একটি মাত্র জীবন বাঁচে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন বইপড়া অবস্থায় সচল হয়ে ওঠে মানুষের মস্তিষ্ক। কারণ, মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে দ্রুত সিগন্যাল চলাচল করতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এতে বৃদ্ধ বয়সে আলঝেইমারের মতো ভুলে যাওয়া রোগ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।

বই পড়লে আপনাকে কল্পনা করতেই হবে। একবার ভাবুন তো, ছোটবেলায় হ্যারি পটারের বইগুলো পড়ার অনুভূতি। সবাই যেন হতে চাইত জাদুর স্কুল হগওয়ার্টসের ছাত্র। আবার মিসির আলী বা ফেলুদা পড়ে নিজেই যেন হয়ে উঠতাম সেই যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে কেস সলভ করার মানুষটি।

বই আমাদের সামনে খুলে দেয় নতুন দুয়ার। কখনো আমাদের ধারণাকে করে প্রশ্নবিদ্ধ, আমাদের ভাবতে বাধ্য করে নতুন করে। নিজের চারপাশের বাইরেও যে কত ধরনের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আছে, বই পড়লেই তা যেন আমরা অনুভব করতে পারি। এতে বই অন্য মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যের দুঃখ বুঝতে সাহায্য করে, মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন বই পড়েন, তাঁরা মানসিক সমস্যায় কম ভোগেন। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়লে রক্তচাপ কমে, হার্ট ভালো থাকে। মানসিক অবসাদ কমে।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় -‘বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সাঁকো।’ সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত উক্তি -‘বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না।’ মার্ক টোয়েনের মতে ‘ভালো বন্ধু, ভালো বই এবং একটি শান্ত বিবেক এটি আদর্শ জীবন।’ তলস্তয় বলেছেন– ‘জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজনবই, বই এবং বই।’ কার্ল সেগান এর মতে -‘বই পড়া মানে সময়ের সীমানা পেরিয়ে অন্য কারও কণ্ঠস্বর শোনা। পড়ার অর্থ হলো সময়ের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করা।’ পরিশেষে বলবো, একটি জাতির মনন এবং আত্মিক উন্নয়নের জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : কবি ও গল্পকার

পূর্ববর্তী নিবন্ধবেলা যে পড়ে এলো
পরবর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে