পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ, মানবতার মুক্তিদূত, সায়্যিদিনা মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আ’লামিন প্রিয় নবীজি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন একজন মহান রাষ্ট্র সংস্কারক। দিশেহারা মানবজাতির মুক্তির দিশারী। সত্য পথের পথ প্রদর্শক, ন্যায়পরায়ণ বিচারক, উত্তম শাসক, অসাধারণ দার্শনিক, আদর্শ সেনাপতি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ স্বামী, একজন সৎ ব্যবসায়ী ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত করলেও তাঁর সুমহান মর্যাদায় ঘাটতি রয়ে যাবে। তাঁর উপর অর্পিত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম বিভ্রান্ত মানবজাতির মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ধর্ম কোন সাধারণ ধর্ম নয়, এটি সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শান্তির ধর্ম যা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করে। ন্যায়ের পথে জীবন চালাতে সহায়তা করে, ন্যায় বিচারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করে। পৃথিবীর হাজারো ধর্মের মাঝে ইসলামই একমাত্র অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ধর্ম– যা আখেরাতে একমাত্র সত্য ধর্ম হিসেবে মহান রাব্বুল আ’লামিনের কাছে বিবেচিত হবে–যেখানে অন্য সব ধর্ম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। ইসলাম নামক দ্বীনই আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিধান, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম, আর তোমাদের উপর আমার প্রতিশ্রুত নেয়ামত পুরো করে দিলাম, তোমাদের জন্য জীবন বিধান হিসেবে আমি ইসলামকেই পছন্দ করলাম’–সূরা– মায়েদা–২। উক্ত একটি আয়াতের মাধ্যমেই বুঝা যায়, ইসলামই আল্লাহর কাছে একমাত্র গৃহীত দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘নিঃসন্দেহে জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহতায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তারা নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশঃবর্তি হয়ে মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের কাছে সঠিক জ্ঞান আসার পর। যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তাঁর জানা উচিৎ) অবশ্যই আল্লাহতায়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’– সূরা ইমরান–১৯। সর্বকালের সকল যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন গুনে ধরা সমাজের একজন বৈপ্লবিক কারিগর। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় যে আরবরা পৃথিবীর সবচেয়ে অসভ্য জাতি হিসেবে বিবেচিত ছিল, সে জাতিকে তিনি পরিণত করেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবে। তাঁরা মহানবীর সাহচর্যে এসে তাদের জীবনকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছিলেন। নিজেদের এলোমেলো জীবনকে মাটির সাথে পিষে পেছনে ফেলে রেখে একটি সুন্দর, উন্নত ও আদর্শ জীবনকে বেছে নিয়েছিল আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর হাত ধরে। তিনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে যে দূর্দান্ত বিপ্লব ঘটিয়েছেন তা আগে ও পরের দুনিয়ায় আর কোন দৃষ্টান্ত নেই। তাঁর ওফাতের দেড় হাজার বছর গত হয়ে গেল কিন্তু তাঁর জীবন দর্শন, জীবন চরিত, তাঁকে নিয়ে গবেষণা, তাঁকে নিয়ে পৃথিবীর মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা মোটেই কমেনি, বরং কেবলই বাড়ছে আর বাড়ছে। তাঁর জীবনিগ্রন্থ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় লিখিত হয়েছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দ্বিতীয় ব্যক্তির জীবনী গ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি এমন এক মহান শাসক যিনি মদিনা রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে চারটি ধর্মের মানুষদের মাঝে সহাবস্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইসলাম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিক ধর্মের মানুষদের মাঝে যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ মদিনা রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল তা পৃথিবীর আর কোন রাষ্ট্রে সম্ভব হয়নি, আগামী কেয়ামত অবধিও সম্ভব হবে না। তিনি ছিলেন একজন সু–বিচারক। বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন কঠোর–আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ন্যায় বিচারের ফর্মুলা তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন তাঁর আলোকে তিনি অবহেলিত মানুষের মাঝে ন্যায় বিচার করতেন, ‘অবশ্যই আমি সত্য দ্বীনের সাথে তোমার উপর এই গ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে করে আল্লাহতায়ালা তোমাকে যা দেখিয়েছেন তার আলোকে তুমি মানুষদের মাঝে বিচার মীমাংসা করতে পার’– সূরা আন নিসা– ১০৫। মহানবী ছিলেন মাসুম ও বে–গুণাহগার। তিনি ছিলেন সত্যের মানদন্ড এবং দুনিয়া আখেরাতে সত্যের মানদন্ডই থাকবেন। তাঁর আগমনের সু–সংবাদ দিয়ে আল্লাহতায়ালা পথভ্রষ্ট আরবদের সম্বোধন করে বলেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল’– সূরা– তওবা–১২৮। আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘এমনিভাবে আমি আপনাদের প্রতি আরবী ভাষায় কোরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশেপাশের লোকদের সতর্ক করেন’ সূরা– আশশূরা–৭। তাঁর সান্নিধ্যে এসে আরবের সবচেয়ে কুৎসিত মানুষগুলো পরিণত হয়েছিল সুন্দর মানুষে। পথহারা আরব বেদুঈনরা মহানবীর হাতে হাত রেখে ইসলাম কবুল করেছিলেন। তাঁর মুখনিঃসৃত কথাগুলোকে সাহাবীগণ নোট করে রাখতেন যত্ন সহকারে–যা পরবর্তীতে সহীহ হাদিস হিসেবে মানবজাতির কাছে পৌঁছে গিয়েছে। উম্মতে মোহাম্মদীর মাঝে যে সততা, নিষ্ঠা, ধর্মীয় অনুশাসন এখনো বিরাজমান তার সবটুকুই এসেছে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীদের মাধ্যমে। আল্লাহতায়ালার উপর যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিতাব নাযিল হয়েছে সে ব্যাপারে কোরআন বলছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের মাঝে একটি উজ্জ্বল, জ্যোতি ও সুস্পষ্ট কিতাব এসে গেছে’– সূরা মায়েদা– ১৫। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যে একজন উত্তম আদর্শ তা আল্লাহতায়ালা নিজেই সার্টিফাই করেছেন এভাবে, ‘(হে মুসলমানরা) তোমাদের জন্য অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে– এটা এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্যে যে আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ এবং পরকালের (মুক্তির) আশা করে, সে বেশি পরিমাণে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে’– সূরা– আহযাব–২১। তিনি ছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী আর সেটিও আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিয়ে বলছেন এভাবে, ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ সূরা– আল কলম–৪। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্যে কোমল হৃদয়ের হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত’– সূরা ইমরান–১৫৯। আল্লাহতায়ালা তাঁকে প্রেরণ করেছেন মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর কাছে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’ সূরা– হজ–১০৭। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর জীবন এতই স্বচ্ছ ও শুদ্ধ যে তিনি হয়েছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম মানবের মডেল। তিনি ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, তাঁর আগমনের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা নবুয়্যতের সিলসিলা সমাপ্ত করে দিয়েছেন।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (ইএনটি)-অবসরপ্রাপ্ত, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ












