যে নারী মহাবিশ্বের অদৃশ্য অংশ দেখতে পেয়েছিলেন

ভাবানুবাদ: পল্লবী বড়ুয়া | শনিবার , ২২ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

রাতের আকাশে আমরা যা দেখিতারা, গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ কিংবা দূরের গ্যালাক্সিতা মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ ছবি নয়। দৃশ্যমান বস্তুগুলোর বাইরে এমন বিপুল পরিমাণ পদার্থের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে, যা আলো শোষণ, প্রতিফলন বা বিকিরণ করে না। তাই সরাসরি দেখা যায় না। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা অদৃশ্য পদার্থ। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই রহস্যময় জগতের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ প্রতিষ্ঠায় যাঁর কাজ নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল, তিনি মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেরা কুপার রুবিন।

১৯২৮ সালের ২৩ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসিতে জন্ম ভেরা রুবিনের। ছোটবেলা থেকেই রাতের আকাশ তাঁকে আকৃষ্ট করত। কিশোরী বয়সে তাঁর প্রকৌশলী বাবা তাঁকে একটি টেলিস্কোপ তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন। পরে ভাসার কলেজ থেকে স্নাতক, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। কিন্তু যে সময়ে রুবিন জ্যোতির্বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, সেই সময়ে এই জগৎ নারীদের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। তার একটি প্রায় অবিশ্বাস্য উদাহরণ ক্যালিফোর্নিয়ার পালোমার অবজারভেটরি। বিংশ শতকের মাঝামাঝি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণাগারগুলোর একটি হলেও সেখানে নারীদের পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি ছিল না। ১৯৬৫ সালে রুবিন প্রথম নারী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সেখানে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। বাধাটির হাস্যকর দিকটিও তিনি পরে স্মরণ করেছেনঅবজারভেটরির একমাত্র শৌচাগারের দরজায় লেখা ছিল দগবহ্থ। রুবিন একটি স্কার্ট পরা নারীর ছবি এঁকে দরজায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট ঘটনাটি আসলে তখনকার বিজ্ঞান জগতের বড় একটি বাস্তবতার প্রতীকপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন ধরে নিয়েই তৈরি হয়েছিল যে বিজ্ঞানী হবেন পুরুষ।

তবে রুবিনের গল্পকে শুধু নারী হিসেবে বাধা অতিক্রম করার গল্প করলে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়টিই আড়ালে পড়ে যায়। তিনি ছিলেন অসাধারণ পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ১৯৬৫ সালে Carnegie Institution এর Department of Terrestrial Magnetismএ যোগ দেওয়ার পর যন্ত্রবিদ কেন্ট ফোর্ডের সঙ্গে তাঁর গবেষণা মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেই বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

বিষয়টি সাধারণভাবে বোঝা কঠিন নয়। একটি সর্পিল গ্যালাক্সিকে ভাবা যেতে পারে অসংখ্য নক্ষত্রের বিশাল ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থা হিসেবে। গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরে গেলে দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণের ভিত্তিতে নক্ষত্রের কক্ষপথের গতি কমে আসার কথা। রুবিন ও ফোর্ড প্রথমে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি এবং পরে আরও বহু সর্পিল গ্যালাক্সির নক্ষত্র ও গ্যাসের গতিবেগ পরিমাপ করলেন। কিন্তু তাঁরা দেখলেন অন্য কিছুগ্যালাক্সির বাইরের দিকের নক্ষত্র প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত চলছে। অনেক ক্ষেত্রে দূরের নক্ষত্রগুলোর গতি কেন্দ্রের কাছাকাছি নক্ষত্রের মতোই রয়ে যাচ্ছে। এই ফলাফলকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাট গ্যালাক্টিক রোটেশন কার্ভ’। সমস্যাটা ছিল গুরুতর। আমরা যতটুকু পদার্থ দেখতে পাচ্ছি, তার মহাকর্ষ দিয়ে ওই গতিবেগ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। শুধু দৃশ্যমান পদার্থ থাকলে এত দ্রুত চলা বাইরের নক্ষত্রগুলোর আচরণ অন্য রকম হওয়ার কথা। ফলে একটি সম্ভাবনা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠলগ্যালাক্সির মধ্যে এমন বিপুল পরিমাণ ভর রয়েছে, যা টেলিস্কোপে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু যার মহাকর্ষ নক্ষত্রগুলোর গতিকে প্রভাবিত করছে। NASAর ভাষ্যেও রুবিনের পর্যবেক্ষণকে ডার্ক ম্যাটারের ধারণা বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়।

তবে এখানে একটি ঐতিহাসিক ভুল প্রায়ই করা হয়। ভেরা রুবিন ডার্ক ম্যাটারের ধারণার প্রথম প্রস্তাবক নন। ১৯৩৩ সালে সুইসমার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎস জুইকি কোমা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গ্যালাক্সিগুলোর অস্বাভাবিক গতিবেগ দেখে দৃশ্যমান পদার্থের বাইরে বিপুল ‘অদৃশ্য’ ভরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর ধারণা বহু বছর মূলধারার জ্যোতির্বিজ্ঞানে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। কয়েক দশক পরে রুবিন, ফোর্ড এবং তাঁদের সহযোগীদের সর্পিল গ্যালাক্সির রোটেশনকার্ভ পর্যবেক্ষণ ডার্ক ম্যাটারের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রমাণ হাজির করে। রুবিনের কাজের গুরুত্ব এখানেই। তিনি এমন কিছু সরাসরি দেখেননি, যাকে ‘ডার্ক ম্যাটার’ বলে টেলিস্কোপে শনাক্ত করা যায়। বরং দৃশ্যমান নক্ষত্রের আচরণ দেখে অদৃশ্য কিছুর মহাকর্ষীয় প্রভাব শনাক্ত করেছিলেন। অনেকটা বাতাসকে দেখতে না পেলেও পাতার নড়াচড়া দেখে তার উপস্থিতি বোঝার মতো। আজও ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। কিন্তু মহাবিশ্বে তার মহাকর্ষীয় প্রভাবের পক্ষে গ্যালাক্সির ঘূর্ণন থেকে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং পর্যন্ত বহু ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এই যুগান্তকারী কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ১৯৮১ সালে রুবিন যুক্তরাষ্ট্রের National Academy of Sciencesএর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে পান যুক্তরাষ্ট্রের National Medal of Science। পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে তাঁর পর্যবেক্ষণমূলক মহাজাগতিক গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, তাঁর কাজ দেখিয়েছে মহাবিশ্বের বিপুল পরিমাণ পদার্থ অদৃশ্য। ১৯৯৬ সালে তিনি Royal Astronomical Societyএর Gold Medal পানক্যারোলিন হার্শেলের ১৮২৮ সালের পুরস্কারের পর এই পদক পাওয়া প্রথম নারী তিনি।

কিন্তু একটি পুরস্কার তিনি কখনো পাননিসেটি নোবেল। রুবিনের জীবদ্দশায় ডার্ক ম্যাটার গবেষণার জন্য তাঁকে নোবেল না দেওয়া নিয়ে বিজ্ঞানজগতে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। তবে ‘তাঁর নোবেল পাওয়া উচিত ছিল’এটি একটি মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়। নোবেল কমিটি তাদের মনোনয়ন ও আলোচনার নথি ৫০ বছর গোপন রাখে; ফলে রুবিনকে কেন পুরস্কৃত করা হয়নি, তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর কাজের গুরুত্ব বোঝাতে নোবেল না পাওয়াকে তাই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করারও প্রয়োজন নেই।

বরং রুবিন নিজেই নারী বিজ্ঞানীদের জন্য জায়গা তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ও কমিটিতে আরও বেশি নারী অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে কথা বলেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিয়েছেন। চার সন্তানের মা রুবিন একই সঙ্গে গবেষণা ও পরিবার চালিয়েছেন; তাঁর চার সন্তানই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান বা গণিত বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন।

২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৮৮ বছর বয়সে ভেরা রুবিন মারা যান। কিন্তু তাঁর নাম এখন মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত। চিলিতে নির্মিত Vera C. Rubin Observatory তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই আধুনিক পর্যবেক্ষণাগারের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিসহ মহাবিশ্বের বড় রহস্যগুলো সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা। যে নারী দৃশ্যমান নক্ষত্রের গতির মধ্যে অদৃশ্য পদার্থের চিহ্ন খুঁজেছিলেন, তাঁর নামেই এখন একটি নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করবে।

বলাই যায়, ভেরা রুবিনের জীবন তাই শুধু পুরুষপ্রধান বিজ্ঞানজগতে একজন নারীর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস নয়। আরও বড় অর্থে এটি প্রমাণের প্রতি আস্থা রাখার গল্প। নক্ষত্রগুলোর গতি প্রচলিত হিসাবের সঙ্গে মিলছিল না। সেই অমিলকে ত্রুটি ভেবে সরিয়ে না রেখে রুবিন প্রশ্ন করেছিলেনআমাদের জানা মহাবিশ্বের ছবিটিই কি অসম্পূর্ণ? সেই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে সাহায্য করেছে। আমরা যা দেখতে পাই, তার বাইরেও যে বিপুল এক অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, তার উপস্থিতি বুঝতে শিখেছি দৃশ্যমান নক্ষত্রের গতির মধ্য দিয়ে। আর সেই বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে একটি নামভেরা রুবিন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি এখন শুধু স্পর্শ নয়
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে ২০ লিটার চোলাই মদসহ আটক ৪