একজন নারী ভোরে ঘুম থেকে উঠে সন্তানের টিফিন তৈরি করেন, অফিসে গিয়ে সময়মতো কাজ শেষ করেন, ফেরার পথে বাজার করেন, বাড়ি ফিরে রান্না করেন, রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসিমুখে একটি ছবি পোস্ট করেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তিনি সবকিছু অনায়াসে সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু সেই হাসিমুখের আড়ালে হয়তো জমে আছে ক্লান্তি, অপরাধবোধ এবং এক অদৃশ্য চাপ–সবকিছুতেই নিখুঁত হওয়ার চাপ।
আজকের নারীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, বেশি কর্মক্ষম এবং বেশি স্বাধীন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রত্যাশাও। এখন একজন নারীকে শুধু ভালো ছাত্রী বা দক্ষ কর্মী হলেই হয় না; তাঁকে একই সঙ্গে আদর্শ মা, যত্নশীল মেয়ে, সফল পেশাজীবী, সামাজিকভাবে সক্রিয়, শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় এবং মানসিকভাবে সব সময় ইতিবাচক থাকারও এক অলিখিত চাপ বহন করতে হয়। এই অসম্ভব প্রত্যাশার ভারই ধীরে ধীরে অনেককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।
মনোবিজ্ঞানে একটি শব্দ আছে–পারফেকশনিজম। এর অর্থ শুধু ভালো কাজ করার চেষ্টা নয়; বরং ভুল করার ভয়, সবসময় সর্বোচ্চ মানে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা এবং সামান্য ব্যর্থতাকেও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা। গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর পারফেকশনিজম দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, অনিদ্রা, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সমস্যা হলো, এই পারফেকশনিজম অনেক সময় ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়; সামাজিকভাবে তৈরি হয়। ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়, ভুল করা যাবে না, সবাইকে খুশি রাখতে হবে, সংসার সুন্দর রাখতে হবে, নিজের কষ্ট প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ। ফলে বড় হওয়ার পরও অনেক নারী নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করতে পারেন না। সাহায্য চাইতেও সংকোচ বোধ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন আমরা এমন অসংখ্য ছবি দেখি, যেখানে কারও সংসার নিখুঁত, কারও সন্তান অসাধারণ, কারও কর্মজীবন ঈর্ষণীয়, কারও ভ্রমণ বা জীবনযাপন যেন সব সময় আনন্দে ভরা। কিন্তু এসব ছবির বাইরে যে ক্লান্তি, ব্যর্থতা বা সংগ্রাম রয়েছে, তা খুব কমই দেখা যায়। ফলে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই অকারণ হতাশায় ভোগেন। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে চাপটি আরও জটিল। অফিসে দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে, আবার বাড়িতে ফিরে পরিবারের প্রতিও একই রকম মনোযোগ দিতে হবে। অনেক পরিবারে এখনও ঘরের কাজকে যৌথ দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয় না। ফলে দিনের শেষে একজন নারী এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়ান, যেখানে তিনি যতই কাজ করুন, মনে হয় কিছু না কিছু বাকি রয়ে গেছে। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় অপরাধবোধ–যেটি পারফেকশনিজমের সবচেয়ে বড় খাদ্য।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব সময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা মানুষকে সৃজনশীল করে না; বরং অনেক সময় নতুন কিছু শুরু করার সাহস কমিয়ে দেয়। কারণ, ভুল হওয়ার ভয়ে মানুষ চেষ্টা করতেই চায় না। কর্মক্ষেত্রে, পড়াশোনায় কিংবা ব্যক্তিগত জীবনেও এই মানসিকতা অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর একটি সামাজিক মূল্যও আছে। একজন নারী যদি সব সময় নিজের সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করতে থাকেন, তাহলে একসময় তাঁর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ পরিবার, সম্পর্ক এবং কর্মজীবন–সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। তাই নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সুস্থ জীবনের অপরিহার্য শর্ত। এর অর্থ এই নয় যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা খারাপ। নিজের কাজ ভালোভাবে করার চেষ্টা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু উৎকর্ষ আর পরিপূর্ণতা এক জিনিস নয়। উৎকর্ষের লক্ষ্য মানুষকে শেখায়, উন্নতির সুযোগ সব সময় থাকে। আর পরিপূর্ণতার চাপ মানুষকে বিশ্বাস করায়, একটি ভুলই সব অর্জনকে মূল্যহীন করে দিতে পারে।
এই জায়গায় পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যদি সব সময় প্রমাণ করতেই ব্যস্ত থাকেন যে তিনি সব সামলাতে পারেন, তাহলে তাঁর ক্লান্তি অনেকের চোখেই পড়ে না। অথচ দায়িত্ব ভাগাভাগি, বিশ্রামের সুযোগ এবং মানসিক সমর্থন একজন মানুষের সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও বাড়ায়। নিখুঁত মানুষ নয়, সুস্থ মানুষই একটি পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজকে বেশি সমৃদ্ধ করতে পারেন। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াও জরুরি। সব কাজ প্রতিদিন সমানভাবে হবে না, সব সিদ্ধান্তই নিখুঁত হবে না, সব মানুষের প্রত্যাশাও পূরণ করা সম্ভব নয়। এটি ব্যর্থতা নয়; এটাই মানুষের স্বাভাবিক জীবন। নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়া আত্মসমর্পণ নয়, বরং আত্মজ্ঞান।
আজকের পৃথিবীতে নারীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগ যেন নতুন এক চাপের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। একজন নারীকে সব সময় সেরা কর্মী, সেরা মা, সেরা স্ত্রী, সেরা কন্যা কিংবা সেরা মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার বদলে তাঁকে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
সবকিছুতেই নিখুঁত হওয়ার চেয়ে নিজের জীবনের সঙ্গে সৎ থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানুষকে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা নয়, টিকিয়ে রাখে ভারসাম্য। আর সেই ভারসাম্যের শুরু হয় একটি সহজ উপলব্ধি থেকে–সব সময় নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নয়।












