অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মাধ্যম লাইটারেজ জাহাজ সেক্টরে নৈরাজ্য চলছে। সাধারণ জাহাজ মালিকদের জাহাজ দিনের পর দিন অলস ভাসলেও প্রভাবশালীদের জাহাজ সিরিয়ালবিহীনভাবে একের পর এক ট্রিপ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। এতে লাইটারেজ জাহাজের স্বাভাবিক ব্যবসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সাধারণ জাহাজ মালিকদের মধ্যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সিরিয়ালবিহীনভাবে চলাচলের দায়ে ৫৬টি জাহাজের বে ক্রসিং সনদ স্থগিত করে দিয়েছেন। এতে এসব জাহাজ আর মোহনা অতিক্রম করতে পারবে না। এতগুলো জাহাজের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সেক্টরে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রভাবশালী মালিকদের জাহাজও এই তালিকায় রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, অন্তত ৪শ লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল না নিয়ে চলাচল করছে। ক্রমান্বয়ে অন্য জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, আমদানি–বাণিজ্যের ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পরিবাহিত হয়। এই কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য নিয়ে বড় বড় মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে আসে। ড্রাফটের কারণে এসব জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। বহির্নোঙরে গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করা হয়। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একযোগে তিন–চারটি লাইটারেজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে এসব পণ্য কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের নিজস্ব জাহাজের বাইরে দেশের অধিকাংশ লাইটারেজ জাহাজের কার্যক্রম সমন্বয় করে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। প্রতিদিন বার্থিং সভার মাধ্যমে কোন মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে কতটি লাইটারেজ জাহাজ যাবে তা নির্ধারণ করা হয়। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সব জাহাজ মালিকের মধ্যে কাজের সুযোগ সুষমভাবে বণ্টন করা এবং বহির্নোঙরে পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু প্রভাবশালী কিছু জাহাজ মালিক বিডব্লিউটিসিসির এই সিস্টেমের বাইরে গিয়ে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ পরিচালনা করছে। এতে একেকটি জাহাজ দুই–তিন ট্রিপ করে মাসে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে। অপরদিকে সাধারণ জাহাজ মালিকদের অনেক জাহাজ অলস ভাসছে।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তর এ বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৫৬টি জাহাজের বে ক্রসিং পারমিশন স্থগিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরসমূহ ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নির্বিঘ্ন ও সুশৃঙ্খলভাবে পণ্য পরিবহন করার স্বার্থে সরকার নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরসমূহে পণ্য পরিবহন নীতিমালা, ২০২৪ প্রণয়ন করে। নীতিমালার ৭.১ ধারা অনুযায়ী বিডব্লিউটিসিসি কর্তৃক বরাদ্দ বা ছাড়পত্র ব্যতীত কোনো লাইটার জাহাজ বাংলাদেশের কোনো সমুদ্র বন্দর, সমুদ্র উপকূলীয় নদীবন্দর ও নদীর উভয় পাড়ে অবস্থিত সকল প্রকার জেটি, সমুদ্র নোঙরে আগত মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য পরিবহন করতে পারবে না। ব্যত্যয়ে মহাপরিচালক, নৌপরিবহন অধিদপ্তর উক্ত লাইটার জাহাজের সার্ভে, উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র বাতিল বা স্থগিত করিতে পারবে। তবে শর্ত থাকে, যে সকল ফ্যাক্টরি ও গ্রুপ অব কোম্পানির নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে, সে সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অব্যাহতিপত্র সাপেক্ষে তাদের নিজস্ব পণ্য কেবলমাত্র নিজস্ব জাহাজে পরিবহন করতে পারবে। যদি ফ্যাক্টরি ও গ্রুপ অব কোম্পানির পণ্য পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হয়, তবে বিডব্লিউটিসিসি এর মাধ্যমে বরাদ্দ গ্রহণ করতে হবে। এ অবস্থায় বিডব্লিউটিসিসির ছাড়পত্র ব্যতীত পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত থাকায় ৫৬টি জাহাজের বে ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়েছে।
জাহাজগুলো হচ্ছে এমভি সিটি–৪০, এমভি সিটি–৪১, এমভি সিটি–৪২, এমভি সিটি–৪৩, এমভি সিটি–৪৪, এমভি সিটি–৪৫, এমভি সিটি–৪৬, এমভি সিটি–৪৭, এমভি সিটি–৪৮, এমভি সিটি–৪৯, এমভি সিটি–৫০, এমভি সিটি–৫১, এমভি সিটি–৫২, এমভি সিটি–৫৩, এমভি সিটি–৫৪, এমভি সিটি–৫৫, এমভি সিটি–৫৬, এমভি সিটি–৫৭, এমভি সিটি–৫৮, এমভি সিটি–৫৯, এমভি সিটি–৬০, এমভি সিটি–৬১, এমভি সিটি–৬২, এমভি রুপসী–১, এমভি রুপসী–২, এমভি রুপসী–৩, এমভি রুপসী–৪, এমভি রুপসী–৫, এমভি রুপসী–৬, এমভি রুপসী–৭, এমভি রুপসী–৮, এমভি রুপসী–৯, এমভি রুপসী–১০, এমভি মুহুরী–২, এমভি মুহুরী–৩, এমভি মুহুরী–৪, এমভি বিএইচএস–৮, এমভি বিএইচএস–৯, এমভি বিএইচএস–১১, এমভি এম এ বেপারী–৭, বার্জ হাজী সেলিম–১, বার্জ হাজী সেলিম–২, এমভি হাজী সেলিম–১, এমভি হাজী সেলিম–২, এমভি মদিনা ফাইভ, এমভি মদিনা সেভেন, এমভি মদিনা টু প্লাস, এমভি নিউটেক–২, এমভি সায়ান সেলিম–১, এমভি সায়ান সেলিম–২, এমভি সায়ান সেলিম–৩, এমভি সী টেক–২, এমভি সবিতা–১, এমভি সবিতা–৫, এমভি সপ্তবর্না–১, এমভি সপ্তবর্না–২ এবং এমভি জেড এন–২।
বে ক্রসিং পারমিশন স্থগিত করা এসব জাহাজ এখন আর মোহনা অতিক্রম করে সাগরে গিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য পরিবহন করতে পারবে না।












