বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের শিকড়

মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু | সোমবার , ৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ

কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ভৌগোলিক সীমানায় নয়; বরং নিহিত থাকে তার ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীন সত্তার চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে। তাই বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের অবধারিতভাবে ফিরে যেতে হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা দলীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, অসামপ্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা এবং দেশপ্রেম, এই মৌলিক মূল্যবোধগুলোর সম্মিলিত রূপই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনাই আমাদের রাষ্ট্রগঠনের আদর্শ এবং জাতিসত্তার প্রাণশক্তি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আকস্মিক কোনো ঘটনার ফল নয়; এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের স্বাভাবিক পরিণতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের গণরায়, প্রতিটি ঘটনাই স্বাধীনতার পথে জাতিকে এক ধাপ করে এগিয়ে নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে, আর ২৫ মার্চের নির্মম গণহত্যা বাঙালিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য পথে ঠেলে দেয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মানুষের সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার পর প্রণীত সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব নীতি কেবল সাংবিধানিক ঘোষণা নয়; এগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র নির্মাণের দিকনির্দেশনা। সংবিধানের এই দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়রাষ্ট্রের মর্যাদা তখনই অর্থবহ হয়, যখন নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন সমানভাবে নিশ্চিত হয়।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতি, বৈষম্য, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং সুশাসনের ঘাটতি আমাদের উন্নয়নের ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। অর্থনৈতিক অগ্রগতি যদি নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের সঙ্গে সমান্তরালভাবে না এগোয়, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করেনি। ফলে ইতিহাসের সত্যকে দলিল, গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক উপায়ে তাদের সামনে উপস্থাপন করা জাতীয় দায়িত্ব। ইতিহাসের বিকৃতি কেবল অতীতকে আঘাত করে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মপরিচয়কেও দুর্বল করে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আবেগের পাশাপাশি বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার বিষয় হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

একটি বিষয় আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অতীতের কোনো স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি একটি চলমান নৈতিক অঙ্গীকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, অন্যায়ের প্রতিবাদ, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা, মতের ভিন্নতাকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ এবং ধর্মবর্ণলিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা, এসবের মধ্য দিয়েই এই চেতনা জীবন্ত থাকে।

বাংলাদেশের আগামী দিনের শক্তি হবে এমন একটি প্রজন্ম, যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, জ্ঞানে সমৃদ্ধ, ইতিহাসসচেতন এবং নৈতিক মূল্যবোধে দৃঢ়। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু একটি জাতিকে মহান করে তার চরিত্র, মূল্যবোধ এবং আদর্শ।

পরিশেষে বলা যায়, সময়ের পরিবর্তনে সরকার, নীতি কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে; কিন্তু একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি কখনো বদলায় না। বাংলাদেশের সেই চিরন্তন ভিত্তি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনাই আমাদের স্বাধীনতার প্রেরণা, রাষ্ট্রগঠনের নৈতিক ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। এই মূল্যবোধকে ধারণ করেই বাংলাদেশ আরও ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বসভায় তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ
পরবর্তী নিবন্ধকাগজে মুদ্রিত বই পড়ার অনুভূতি আলাদা