চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান আরো কমে গেছে। শুধুমাত্র আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর হওয়ায় চট্টগ্রামে বিকল্প কোনো উৎস থেকেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর ট্রিপ করার পর থেকে গ্যাসের যোগান ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ঢাকার দিকে গ্যাস নেওয়া কিছুটা বাড়ানোর ফলে চট্টগ্রামের সংকট প্রকট হয়েছে। ভাসমান টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন থাকবে বলে জানিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)।
চট্টগ্রামে গতকাল প্রায় ২শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ চাহিদার ৫০ শতাংশে নেমে আসায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এতে করে শুধু সিএনজি স্টেশন, শিল্পকারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ারই সংকটে পড়েনি, একইসাথে বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির চুলার আগুনও নিভে গেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। কেবলমাত্র কাফকোতে সার এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুতের উৎপাদন চলছে।
সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট পুরনো। এখানকার গ্যাস সেক্টরের পুরোটা আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর। কোনো কারণে এলএনজি আমদানি বা সরবরাহ ব্যাহত হলে চট্টগ্রামে গ্যাসের বিকল্প কোনো উৎস নেই। এখানে স্বাভাবিক অবস্থায় গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪শ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৭০–২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান আরো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে চট্টগ্রামে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল। এতে করে গ্যাসের চাপ কমে যায় এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা এবং সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। গত সপ্তাহে দেওয়া হচ্ছিল ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। পরশু চট্টগ্রামে গ্যাস দেওয়া হয়েছে ২১৭ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল ২শ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি দেওয়া হয়। এতে করে চট্টগ্রামে গ্যাসের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও অপরটি দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি সামিট। সম্প্রতি এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের যোগান কমে গেছে। এই দুটি এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাসের একটি অংশের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টর। ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাসের যোগান কমে গেছে।
গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। চট্টগ্রামে কেবলমাত্র কাফকোতে সার এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুতের উৎপাদন চলছে। চাহিদার সাথে যোগানের ব্যবধান বাড়ার সাথে সাথে কমে গেছে গ্যাসের চাপ। এতে করে রান্নাঘরের চুলা থেকে শুরু করে কারখানার বয়লার পর্যন্ত সবই বন্ধ হয়ে গেছে।
চাহিদার অর্ধেক গ্যাস কমিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাসহ সবগুলো খাতে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গতকাল সকাল থেকে নগরী এবং জেলার বিভিন্ন স্থানের রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের একেকটি স্টেশনের আশেপাশে কয়েক কিলোমিটার গাড়ির লাইন তৈরি হয়। গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর বিভিন্ন রিফুয়েলিং স্টেশনের সামনে সিএনজি টেক্সির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
চালকেরা বলেন, সন্ধ্যা ৬টায় গ্যাস দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাত ১২টা নাগাদ গ্যাস দেবে বলে জানিয়েছে। আমরা ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার জন্য এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে সরে যাওয়ার মতো গ্যাসও গাড়িতে নেই। তারা বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্যাসের যোগান না বাড়ালে এই অবস্থা থেকে নিস্তার মিলবে না।
কেজিডিসিএলের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা গতকাল আজাদীকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। আমরা দুইশ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাচ্ছি। এতে করে প্রতিটি সেক্টরে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, একটি ভাসমান টার্মিনালের সমস্যার কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি থেকে কবে নাগাদ মুক্তি পাওয়া যাবে তার কোনো রোডম্যাপ আমাদের কাছে নেই। ভাসমান টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই থাকবে। ঢাকার দিকে গ্যাস বাড়তি নিয়ে গেলে আমাদের অবস্থা আরো নাজুক হবে।
কেজিডিসিএলের উপ–মহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান বলেন, ১০ দিন ধরে সংকট চলছে। শনিবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের প্রায় সব এলাকা সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।












