ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। রোজ মঙ্গলবার। শ্রদ্ধেয় গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ভাই ফোন করে বললেন, ‘খবর শুনেছো? সোমা তো নেই।’ নেই মানে? তারপর জঙ্গী ভাই আরও বললেন, “একটু আগে রোশাঙ্গীর বাচ্চু জানালো। তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাচ্ছি সংবাদটা।” দ্রুত সংবাদটি এলো। সোমা’পা নেই। বাদ আসর জানাজা। মীরপুর ডিওএইচএস মসজিদে। এ এক অবিশ্বাস্য দুঃসংবাদ। এমন সংবাদ দেবেন জঙ্গী ভাই এটা কল্পনারও বাইরে।
হতভম্ব। এর কারণটি হলো, মাত্রই সপ্তাহ খানেক আগে জঙ্গী ভাইয়ের বাসায় সৈকতচারী নিয়ে আলাপচারিতায় সোমা’পার প্রসঙ্গ এলো। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জঙ্গী ভাই বলছিলেন, “সোমা প্রচুর সম্ভাবনাময়ী এক শিল্পী। গানে, অভিনয়ে, নাচে এবং পড়ালেখায় দারুণ প্রতিভা রেখেছে। সৈকতচারীর নিয়মিত শিল্পী হিসেবে সোমার স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশনা আজো মনে পড়ে। চাটগাঁইয়া গানগুলো বেশ সাবলীলভাবে গাইতো। অরিন্দম নাট্য সমপ্রদায়েও সোমা নাটক করেছিল। এমন উদ্যোমী ও সম্ভাবনাময়ী শিল্পী সোমা হঠাৎ করেই সাংস্কৃতিক জগত থেকে বিদায় নিলো। সোমা আরও অনেক কিছু করতে পারতো। দিতে পারতো সাংস্কৃতিক জগতকে। কিন্তু কেন জানি পরবর্তীতে সেটা আর হলো না। হয়তো সামাজিক কারণ এবং যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারায়। আমরা এখনো সোমার ঐ সময়টার কথা মনে করি। তুমুল সম্ভাবনা জাগিয়েও আড়ালে – নিভৃতে চলে গেল।” আমারও আফসোসের জায়গাটা ঐখানেই। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারায় সোমা‘পা শেষ পর্যন্ত এভাবেই নিভৃতে চিরবিদায় নিলো।
আমার শৈশব–কৈশোর জীবনের অনেক কিছুর সাথে সোমা আপা জড়িয়ে আছেন। চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জ এলাকায় আমাদের বেড়ে ওঠা। একটি গলির দুইপাশে দুই বাসা। চট্টগ্রাম শহরের স্বনামখ্যাত শিল্পী, সমাজসেবী, অধ্যাপক সালমা চৌধুরীর বড় মেয়ে হাসিনা আহমেদ সোমা। নানা ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, বাংলাদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ। এমন পরিবারের উত্তরসুরী সোমা। সুতরাং তার ধমনীতে তো সাংস্কৃতিক ধারা বইবেই।
১৯৭১ সাল। ১৬ ডিসেম্বর। বিকেল বেলা। হঠাৎ চারদিকে শোরগোল। বিজয়। বিজয়। দেশ স্বাধীন হয়েছে। রাস্তায় বিজয় মিছিল। আমিও গলিতে চলে যাই। সোমা’পা ও বাবুসহ মিলে চিৎকার করি, বিজয় – বিজয় বলে। আমার জীবনের প্রথম বিজয় উদযাপন ছিল এই দুই মানুষের সাথে।
সালমা খালামনির বাসার দরজা খোলা হতো ভোরে। তারপর বন্ধ হতো ঘুমাবার আগে। সারাদিনই ছিল অবাধ যাতায়াত। সোমা’পা পুতুল বানাতেন। সেগুলোর আবার বিয়ে দিতেন। বিয়ের খাবার ছিল নাবিস্কো চকলেট, বাদামের টফি। রাস্তার পাশে গফুরের দোকান থেকে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসতাম। পাশের বাসায় অনুরীণা ও অনিমেষ। ওরাও আমাদের সাথে থাকতো। বাবু ভাই ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী। শব্দ করে পড়তো। আর এজন্য মা’র বকুনীও শুনতাম। যাক, সোমা’পার পাশের বাসাটি ছিল ড. এনামুল হকের। ওখানেও অবাধ যাতায়াত। ঐ বাসার সামনেই পুকুর। আর সেই পুকুরে বল নিয়ে লাফালাফি, সাঁতার কাটা, অহেতুক ডুব দিয়ে দুরন্তপনায় আমাদের মেতে থাকাটাও ছিল আনন্দের।
বছর যায়। সময় গড়িয়ে যায়। আমরাও বড়ো হতে থাকি। ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রামে মৌসুমী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। সালমা খালামনি একদিন ডেকে বললেন, তোরা নাটক করতে পারবি? তোদের দিয়ে নাটক করাবো। রেডিওতে নাটক শুনে আসলেও নাটক সম্পর্কে ধারণা পেলাম ১৯৭৬/৭৭ সালে সেন্ট মেরী‘স স্কুলের মিলনায়তনে অরিন্দম নাট্য সমপ্রদায়ের নাটক দেখে। বেশ মজা পেয়েছিলাম। যাহোক, জুনিয়র লোকালয় নাম দিয়ে আমরা ‘বন্ধু রাজপুত্র’ নামে বিদেশী গল্প অবলম্বনে একটি শিশুতোষ নাটক করি। মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে মঞ্চস্থ হয় মৌসুমি প্রতিযোগিতায়। সোমা’পা, মোহছেনা মিতু (শাহানা খালার মেয়ে), মাহবুব হাসান আঙ্কেলের ছেলে পিঙ্কিসহ আমরা অভিনয়ে যুক্ত ছিলাম। প্রতিযোগিতায় আমরা তৃতীয় স্থান অর্জন করি। পরে এই নাটকটি চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়। ঐ সময়টা ছিল আমাদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতার ও আনন্দের। স্কুল ছুটির পর রিহার্সাল। আর সেই রিহার্সেলে সালমা খালামনি আসার আগেই সোমা’পার কাছে উচ্চারণ ও প্রক্ষেপণের তালিম নিতাম। ঐ সময়ে সোমা’পার কাছে শিক্ষাটা দারুণ কাজে লেগেছে পরবর্তীতে।
ঐ সময়ে একদিন সোমা‘পা জানালেন যে, ‘সৈকতচারী’ নামে একটি গানের দল হয়েছে। ঐ দলে গান করেন। বাসায় রিহার্সাল করতেন হারমনিয়াম বাজিয়ে। ‘ঝড় ফরের লোসা লোসা, ফুইরজা মরিচ কটকইট্টা’… এধরনের গান প্রথম শুনি সোমা’পার কাছে। হাসি পেত শুনে। আর এখন – সেই গান হয়ে গেল গবেষণার বিষয়। সেই সময়ের সৈকতচারীর আরেক সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী, সুরকার শাহবাজ খান পিলু। যিনি আজকের প্রথিতযশা সুরকার, ড্রামার ও গায়ক। পিলুরই সহপাঠী সোমা। স্মৃতি রোমন্থন করে পিলু খান বলেন, “সোমা আসলেই অন্যরকম একজন শিল্পী। খুব সুন্দর গান তুলতে পারতো। তার গানের প্রতি একাগ্রতা, নিষ্ঠা আমাদের আজও মনে পড়ে। কেন যেন সোমা আর গানের জগতে স্থায়ী হলো না। থাকলে আজ বড় শিল্পী হবার প্রচুর সম্ভাবনা ছিল।”
একদিন সোমা’পার বিয়ে হয়ে গেল। সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমারও তখন অন্যজগত। দেখা কম হতো। অনেক বছর পরে দেখা হলো সালমা খালামনির অসুখের সময়। এক ফাঁকে বলি, সোমা‘পা, আমি অরিন্দমে কাজ করছি। রনিদা ( প্রয়াত চিত্র শিল্পী ও ড্রামার সুব্রত বড়ুয়া রনি) ও আমি একটি নাটকে অভিনয়ও করেছি। খুব হেসে বললেন, “শান্তুইয়া, তুই নাটক করিস অরিন্দমে? এখনো আছিস? ভালো। আমি তো পড়হঃরহঁব করতে পারলাম না। লেগে থাকিস। দল ছাড়িস না।”
অরিন্দমের প্রতি আলাদা টান ছিল। দেখা হলে খবরাখবর নিতেন। একসময়ে চট্টগ্রামে চলে এলেন সোমা। জুবিলী রোডে জেমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেন। তখন আমি কোডেক নামে একটি উন্নয়ন সংস্থায়। কোডেকের শিক্ষা বিষয়ক সভা–সেমিনারে আমন্ত্রণ করতাম। আসতো সোমা’পা।
ঢাকায় থাকাকালীন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কাজ করেছে সোমা। তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছে। বীর শ্রেষ্ঠদের নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রগুলো প্রশংসিত হয়েছে। এরমধ্যে একদিন সোমা’পা জেলেজীবন নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করলো। কোডেকে কাজ করার সুবাদে সলিমপুর ও বাড়বকুণ্ড জেলে পাড়ায় গেলাম আমরা। শ্যুটিং করলেন। সাগরেও গেলেন বোটে করে। সোমা’পার এই ভূমিকাটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছিল। নারী নির্মাতা ঐ সময়ে হাতে গোনা।
২০২০ সাল। দেশে করোনা মহামারী চলছে। সকলের খবরাখবর নেয়া – সামাজিকতা মুঠোফোনে সীমাবদ্ধ। ঐ সময় আমি ও আমার স্ত্রী শিউসহ ফেসবুক আইডি খুলি ‘আমাদের বাড়ী মায়ার ছায়া’ নামে। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পীর সাথে আলাপচারিতা এবং তা সরাসরি প্রচার করা। তো, শিউ প্রথমেই বেছে নিয়েছিলো হাসিনা আহমেদ সোমাকে। এই আলাপচারিতাটা ছিল দারুণ প্রাণবন্ত।
জীবন চলেছে জীবনের গতিতে। আমরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। পরবর্তীতে যোগাযোগটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। একসময় মুঠোফোনে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। শেষ বার কথা হয়েছিল এই বছরের জুন মাসের বিশ তারিখ। কোন এক শুক্রবার যাবো মীরপুর ডিওএইচএস বাসায়। এমনই কথা ছিল। তারপর জুলাইয়ের একুশ তারিখ, গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ভাইয়ের সেই নির্মম ফোনকলে জানলাম, সোমা’পা নেই আর। ঢাকা শহরে থেকেও দেখাটা হলো না।
কী অভিমানে, কী দুঃখে নিজেকে এমন নিভৃতচারী করলে সোমা’পা? বাস্তবতার কঠোরতাকে উৎড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। লড়েছেন। লড়ে গেছেন। পাশে দাঁড়াবার অবকাশটুকু হয়নি। মীরপুর ডিওএইচএস মসজিদে নামাজে জানাজা পড়াটাও ছিল আমার জন্য সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনার। বনানী গোরস্থানে শায়িত যখন হলো সোমা’পা, তখন সূর্যও বিদায় নিয়েছে। তার একটু পরেই নামলো বৃষ্টি। রহমতের বৃষ্টি। আর এভাবেই নিভৃতেই চিরবিদায় নিলো আমাদের সম্ভাবনাময়ী একজন তুখোড় শিল্পী হাসিনা আহমেদ সোমা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিকর্মী।











