রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন

| শনিবার , ২৫ জুলাই, ২০২৬ at ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ

রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বলে বুধবার বিকাল থেকে যে গুঞ্জন চলছিল, সেটিই বাস্তব রূপ পেল গতকাল শুক্রবার বিকালে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিকাল সাড়ে ৫টায় সংসদ সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘বিকাল ৫টা ১ মিনিটে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন রাষ্ট্রপ্রধান। ফলশ্রুতিতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি; পদত্যাগপত্রটি আমি গ্রহণ করেছি এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডের সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হল।’

সাহাবুদ্দিন কেন পদত্যাগ করেছেন তার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি গুরুতর অসুস্থ; হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় তিনি ভুগছেন। তার হৃদযন্ত্রের বাইপাস সার্জারি হয়েছে, ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে এবং শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করেছি। সংবিধানে ইতোমধ্যেই আপনারা জানেন, যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছি যদি প্রয়োজন হয়। একইভাবে আমাদের ডেপুটি স্পিকার সাহেব, তিনিও যখন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন, শপথেরই অংশে বর্ণিত থাকে, যখন বলা হবেকোনো কারণে যখন স্পিকারের চেয়ার শূন্য থাকবে, তখন ডেপুটি স্পিকারস্পিকারের পদের দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং আজকে বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে এটি প্রকৃততিনি শারীরিক অসমর্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তার মঙ্গল এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করি। এবং আমার মনে হয়, তিনি মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সবসময়ই।

এক সাংবাদিক বলেন, রাষ্ট্রপতি যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তার সাথে কি কোনো মেডিক্যালের সার্টিফিকেট বা কোনো কিছু সংযুক্ত রয়েছে? কারণ সাধারণ জনমনে একটা প্রশ্ন আছে যে এটি কি আসলে কাগজেকলমে অসুস্থতা নাকি জেনুইন অসুস্থতা? তার অসুস্থতা আসলে কাগজেকলমে নাকি জেনুইন?

জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সাথে দেশের ভালোমন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এর জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নাই, যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন। সুতরাং আমরা আশা করি এই পদত্যাগের ফলে সকল ধোঁয়াশা পরিষ্কার হল। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব কিংবা কনফিউশন যাতে এসব ব্যাপারে না ঘটে।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, এর আগেও রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণে। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ারটা কখনো শূন্য থাকে না। এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি, এটিই হলো বাস্তবতা। আশা করি, সকল ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে।

এর আগে বিকাল ৪টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান’। পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করা হয়ে গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলে দিছি, বুঝে নেন। পরে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলম জানান, গুরুতর অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন।

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতেই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা নিলেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সামলাবেন।

চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংককে যান হাফিজ উদ্দিন। সফরসূচি অনুযায়ী আগামী ২৬ জুলাই তার ফেরার জন্য ফিরতি টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই বুধবার বিকালে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে দেশে বা সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে, সংবিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয়। সে কারণে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করে স্পিকারকে শুক্রবার দেশে ফিরতে অনুরোধ করা হয় বলে কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে সেই অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষা করাতেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। ১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছিল। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ কারণে অনেকেই ধারণা করেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নেপথ্যে স্বাস্থ্যগত কারণের পাশাপাশি তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্বও কাজ করেছে।

কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি ফোনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই ঘটনায় তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি ফোন করে এক সাংবাদিককে বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায় চট্টগ্রাম
পরবর্তী নিবন্ধউল্টো রথযাত্রা উৎসব সম্পন্ন