চট্টগ্রামে গত আড়াই মাসে পানিতে ডুবে ৩২ জন মারা গেছে। এদের মধ্যে ১৮ জনই শিশু। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আগামী সোশ্যাল ফাউন্ডেশনের করা জরিপে উঠে এসেছে এই তথ্য। সংস্থাটির মতে, বৃহত্তর চট্টগ্রামে মাসে গড়ে ৫০ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটছে পানিতে ডুবে। যার মধ্যে ৪৬ জনই শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে বছরে পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে ১৮ হাজার ৬৬৪ জন। পানিতে ডুবে মৃত্যুর এই ভয়াবহতা ঠেকাতে বিশ্বব্যাপী আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। ‘যে কেউ পানিতে ডুবে যেতে পারি, সবাই মিলে প্রতিরোধ করি’–এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।
চট্টগ্রামে বর্ষা এলেই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। নগরীতে জলাবদ্ধতা, গ্রামে পুকুর–ডোবা, পাহাড়ি ছড়া, নদী, খাল, সমুদ্রসৈকত এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর বহু মানুষ, বিশেষ করে শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং নগরীতে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট হিসেবে সামনে এনেছে। বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু এখন অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। নিহতদের প্রায় ৭৫ শতাংশই শিশু। ১ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
জাতীয় তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক প্রতিবেদনে এক বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮২ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক ও সামাজিক দুই কারণে চট্টগ্রাম অন্য জেলার তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে অসংখ্য পুকুর, ডোবা ও জলাশয়। কর্ণফুলী, হালদা, শঙ্খ, মাতামুহুরীসহ বড় নদী, উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্রসৈকত, পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা ও বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের আকস্মিক স্রোত, নগরীর জলাবদ্ধতা এবং নির্মাণাধীন ভবনের খোলা পানিভর্তি গর্ত। এছাড়া শিশুদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং সাঁতার না জানা। নিজেদের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে আগামীর নির্বাহী পরিচালক আলমগীর সবুজ জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ১–৪ বছর বয়সি শিশু, ছেলে শিশু, নিম্নআয়ের পরিবার, গ্রামীণ এলাকার পরিবারহগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যখন অভিভাবকেরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন।
চট্টগ্রামে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধরন কয়েক ভাগে বিভক্ত করা যায় উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, গ্রামে অধিকাংশ বাড়ির পাশে পুকুর রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেড়া বা নিরাপত্তা নেই। বৃষ্টির পানি জমে থাকা গর্ত, বর্ষায় নির্মাণাধীন ভবন, ইটভাটা, নিচু জমি ও খননকৃত স্থানে পানি জমে প্রাণহানি ঘটছে। ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ঢল হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে পাহাড়ি ছড়াগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, পারকি, গুলিয়াখালী, বাঁশখালী, কঙবাজারমুখী পর্যটকদের মধ্যে সতর্কতার অভাব দেখা যায়। কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে গোসল কিংবা মাছ ধরতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।
জনস্বাস্থ্য ও শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। এ ব্যাপারে তারা বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। ৫ বছরের নিচের শিশুদের কখনো একা রাখা যাবে না। বাড়ির পুকুরে বেড়া দিতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা তৈরি করতে হবে।
৫ বছর বয়স থেকেই সাঁতার শেখানো উচিত। বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক জলনিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা। বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। ইউনিয়ন পর্যায়ে উদ্ধার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা। লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারে উৎসাহিত করা। নদী ও সমুদ্রসৈকতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নিয়োগ। পানিতে পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার ও সিপিআর প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ।
চট্টগ্রামের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো বলেছে, প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ের তালিকা, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ জলনিরাপত্তা কর্মসূচি, বর্ষা মৌসুমে গণসচেতনতা অভিযান, স্কুলভিত্তিক সাঁতার শিক্ষা, নির্মাণাধীন ভবনের পানিভর্তি গর্ত ঘিরে রাখা বাধ্যতামূলক করা, জলাবদ্ধ এলাকায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যটন এলাকায় লাইফগার্ড, সতর্ক পতাকা ও মাইকিং বৃদ্ধি করা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট। সড়ক দুর্ঘটনার মতো এটিকেও জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ সচেতনতা, নজরদারি, সাঁতার শিক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। তারা বলেন, বিশ্বে প্রতি বছর সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এসব মৃত্যুর ৯০ শতাংশ ঘটে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে। কিন্তু শিশু–কিশোরদের অকালমৃত্যুর এ বিষয়টি বেশির ভাগ দেশে উপেক্ষিত।
আগামীর নির্বাহী পরিচালক আলমগীর সবুজ বলেন, তারা অনেকদিন থেকে পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করে আসছেন। সাঁতার শেখা ও ডে কেয়ারের উপরে সরকার গুরুত্ব দিলেও তিনি পুকুরে বেষ্টনী দেওয়ার উপর জোর দেন। কারণ সাঁতার শেখার বয়স হওয়ার আগে সেসব শিশু পুকুরে ডুবছে বেষ্টনী তাদের সুরক্ষা দিতে পারে।
জলবায়ুর পরিবর্তন দিন দিন এ ধরনের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সাতটি প্রমাণভিত্তিক কৌশল নিয়ে নতুন কারিগরি নির্দেশিকা (প্রটেক্ট) তুলে ধরেছে। সাতটি কৌশল বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। কৌশলগুলো হচ্ছে, পানির সঙ্গে নিরাপদ মিথষ্ক্রিয়ার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা, উদ্ধার ও পুনরুজ্জীবন সক্ষমতা বাড়ানো, পানিতে কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নৌযান ও জলপথে নিরাপত্তা মানদণ্ড জোরদার করা, মৌলিক সাঁতার ও পানি নিরাপত্তা শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা ও সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করা।
ডব্লিউএইচও মনে করে, ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের মৃত্যুর শীর্ষ ১০ কারণের একটি হলো ডুবে মৃত্যু। নদী, হ্রদ, পুকুর, কূপ, গৃহস্থালির পানির সংরক্ষণ পাত্র ও সুইমিংপুলে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পানিতে ডুবে মৃত্যু এখন শুধু একটু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি উন্নয়নের একটি প্রতিবন্ধকতা। আর এটিকে রোধ করা শুধু সরকারের একটি দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এজন্য দরকার বিভিন্ন দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ।











