‘মা, তোকে ওরা মেরেছিল? থানা প্রাঙ্গণে অপহৃত সাত বছরের শিশুকন্যা তাসকিনকে পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাচ্ছিলেন পিতা দেলোয়ার হোসেন। টানা দুদিনের শঙ্কা, পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন কান্না আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কন্যাসন্তানকে অক্ষত ও সুস্থ অবস্থায় ফেরত পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখও তখন ভিজে ওঠে।
অবশেষে ইতি ঘটেছে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করা শিশু ওয়াসিফা জান্নাত তাসকিন অপহরণ নাটকের। জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে মঙ্গলবার রাতে উপজেলার সরফভাটা এলাকার ইত্যাদি মোড়ের একটি দ্বিতল ভবন থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীসহ চক্রের ৩ সদস্যকে। গ্রেপ্তার তিনজন হলেন ফয়সাল (৩২), সিএনজিচালক রাকিব (২২) ও ব্যাটারি রিকশা চালক মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। তাদেরকে গতকাল সকালে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ব্যবহৃত সিএনজি টেক্সিটি জব্দ করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, শিশু তাসকিনকে অপহরণের মাস্টারমাইন্ড তার বাবার মামাতো ভাই মো. ফয়সাল (৩২)। ঘটনার শুরু ২০ জুলাই সকালে। পশ্চিম সরফভাটা এলাকার ইমাম আজম আবু হানিফা (র.) স্কুলের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসকিন প্রতিদিনের মতো স্কুলে যায়। ক্লাস শেষে অন্য শিশুরা ফিরে এলেও সে বাড়ি ফেরেনি। তাসকিনের এক সহপাঠী জানায়, স্কুল থেকে ফেরার পথে সামনে একটি টেক্সি দাঁড়ানো ছিল। টেঙি থেকে বলা হয়, তাসকিনের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাকে দ্রুত বাবার কাছে নেওয়া হচ্ছে। বাবার অসুস্থতার কথা শুনে তাসকিন টেক্সিতে ওঠে। মেয়ে বাড়ি না ফেরায় ও অপহরণের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় তাসকিনের বাবা দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপর জেলা পুলিশ ও ডিবি অভিযান শুরু করলেও শুরুতে তাদের হাতে কোনো ক্লু ছিল না।
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম বলেন, শিশুটিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবরে স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে থানায় মামলা হলে আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু শুরুতে আমাদের কাছে কোনো ক্লু ছিল না। ওই এলাকায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সিএনজি শনাক্ত করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
তিনি জানান, ঘটনাটি একটি সাত বছরের ছোট্ট শিশুর হওয়ায় পুলিশ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় নামে। যেহেতু শিশু তাই কোনো অঘটন ঘটার আগেই যেন তাকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করতে পারি সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে একটি টেঙি ও চালকের মুখের কিছু অংশ শনাক্ত করি। স্থানীয় ড্রাইভারদের সহায়তায় ওই চালককে চিহ্নিত করে আটক করা হয়।
আটক চালক রাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানতে পারে, ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন প্রবাসফেরত ফয়সাল। অর্থনৈতিক টানাপোড়ন থেকে বাঁচতে ফয়সাল মোটা অংকের টাকা মুক্তিপণ হিসেবে আদায়ের উদ্দেশ্যে নিজের মালিকানাধীন টেঙি ও ব্যাটারি রিকশার চালকদের লোভ দেখিয়ে এই চক্র গড়ে তোলেন।
নিজের ওপর থেকে সন্দেহ সরাতে ফয়সাল অভিনয়ের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তা তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, ফয়সাল এই শিশুটির বাবার আপন মামাতো ভাই। অপহরণের পর সে বাচ্চাটিকে সরফভাটার নিজ ভাড়া ঘরে একাই আটকে রাখে এবং নিজের স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর সে অপহৃত শিশুর পরিবারের সাথে মিলে নিজেই বাচ্চা খোঁজার ভান করতে থাকে। সে আমাদের সাথে থানায় গেছে, স্বজনদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছে। এমনকি বাচ্চা উদ্ধারের জন্য মায়ের সাথে স্থানীয় মাজারে গিয়ে দোয়ায় অংশ নিয়েছে। কেউ যেন তাকে সন্দেহ না করে, সেজন্য সে এই অভিনয় করে যাচ্ছিল।
এসপি বলেন, পুলিশ যখন খুব অ্যাক্টিভ হয়ে ওঠে, তখন ফয়সাল আর সরাসরি মুক্তিপণ চাইতে সাহস পায়নি। সে বুঝতে পেরেছিল মুক্তিপণ চাইলে ধরা পড়ে যাবে। তাই সে প্ল্যান পরিবর্তন করে বাচ্চাটিকে আটকে রেখে সময় নিচ্ছিল। ফয়সালের মানসিক অবস্থা কিছুটা ‘আনস্টেবল’ মনে হয়েছে। আমাদের ভয় ছিল, যেহেতু নিকটাত্মীয়, ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটির কোনো ক্ষতি করে ফেলতে পারে। অতীতে পটিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে আমরা দেখেছি, উদ্ধার হলেও শিশুদের জীবিত পাওয়া যায় না, মেরে লুকিয়ে রাখা হয়। সেই আশঙ্কা থেকে আমরা দ্রুততম সময়ে অভিযান পরিচালনা করি।
মঙ্গলবার গভীর রাতে ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ দল ইত্যাদি মোড় এলাকার ভাড়া বাসা ঘেরাও করে শিশু তাসকিনকে অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় উদ্ধার করে। একই সঙ্গে মূল পরিকল্পনাকারী ফয়সাল ও তার সহযোগীদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসপি মাসুদ আলম বলেন, বাচ্চাটিকে জীবিত ও সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে তার বাবার কোলে ফিরিয়ে দিতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।












