যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা আগামী দুই বা তিন দিন অব্যাহত থাকলে পাল্টা জবাবের নীতি বদলে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণাত্মক অভিযানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন সমঝোতা চুক্তির সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মহসেন রেজায়ির বরাতে গত শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি। তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের প্রতিক্রিয়া আর শুধু পাল্টা জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে সামরিক প্রতিরোধের পর্যায় পেরিয়ে তেহরান ‘আক্রমণ ও সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ ধাপে প্রবেশ করবে এবং এ পরিস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না। রেজায়ি বলেন, ওয়াশিংটনের ‘যুদ্ধ ও আলোচনা’ কৌশল এখন শেষ সীমায় পৌঁছেছে এবং আগামী দিনগুলোতে ইরানি হামলার তীব্রতা আরও বাড়বে।
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। একই সময়ে টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। পারস্য উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঘটনায় ইরান জড়িত বলে ওয়াশিংটন ও মার্কিন সেন্টকম দাবি করার পর থেকেই এ ধারাবাহিক হামলা চলছে। তবে তেহরান শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এদিকে মার্কিন হামলায় ইরানের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে বিবিসি।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, জর্ডান ও সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। গতকাল শনিবারও পারস্য উপসাগরীয় মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে নতুন করে হামলা চালানোর কথা জানায় আইআরজিসি। রয়টার্স জানায়, কুয়েতের একটি পানি শোধনাগার (ডিস্যালিনেশন) কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা কুয়েতের আরিফজান শিবিরে মার্কিন বাহিনীর একটি সাপোর্ট সেন্টারে আঘাত হেনেছে এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করেছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটি ও একটি গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে রয়টার্স বলেছে, তারা এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় তাদের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট ও পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে আগুন লাগলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ঘটনার পর নাগরিকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের পানি শোধনের প্রায় ৪০ শতাংশ সক্ষমতা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হওয়ায় এসব স্থাপনায় হামলা কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুক্রবার উভয় পক্ষ সমুদ্রপথেও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানি জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নৌ–অবরোধ জোরদার করেছে। অন্যদিকে ইরান বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। যুদ্ধবিরতির সময় কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় তেহরান আবারও প্রণালিটি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
এদিকে ইরানের উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অধীনে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহত হামলা চালাচ্ছে এবং ইরান দেশ রক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকায় তেহরানও তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ও চুক্তির বাস্তবায়ন স্থগিত করছে। গরিবাবাদি বলেন, তারা কার্যত সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তাই আমরাও আমাদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছি এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করবো না।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় ৪০ দিন সংঘাত চলার পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়। পরে ১৭ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। এখন ইরানের ঘোষণার পর সেই সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।












