আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণ যে কত উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সাথে উঠা–বসা চলাফেরা, রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে ইল্ম শেখা সবকিছু সাহাবীগণের দৈনন্দিন কর্মসূচীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল। সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ) ছিলেন সত্যের মাপকাঠি এবং তাঁরা দুনিয়ায় আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সন্তুষ্টির ঘোষনাপ্রাপ্ত। সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ) এর অনুসৃত পথের অনুসরণই হল ইসলামের সঠিক পথ নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি। যারা সাহাবায়ে কেরামগণের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছে, তারাই হয়েছে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। হক ও বাতিলের মাঝে একমাত্র পার্থক্যকারী হলেন সাহাবায়ে কেরামগণ। যারা সাহাবায়ে কেরামগণদের সম্মান করেন, তাঁদের অনুসৃত পথে চলেন–তারাই মূলত কোরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারী। সাহাবায়ে কেরামগণদের দেখানো পথ ছাড়া লক্ষ কোটি বারও কোরআন–সুন্নাহ অনুসরণের দাবী করলেও তারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। যুগে যুগে যারা সাহাবায়ে কেরামগণদের প্রদর্শিত পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছে এবং নিজেরা মনগড়া মতবাদ চালু করেছে–তারাই মূলত গোমরাহীর গভীরে নিমজ্জিত হয়েছে। যারা তাঁদেরকে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা না দিয়ে তাঁদের সমালোচনা করেছে, তারাই যুগে যুগে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করছেন, ‘পূর্বসূরীদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামী–মুহাজির (হিজরতকারী) এবং আনসার (সাহায্যকারী)- এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’–সূরা–আত তাওবা– ১০০। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘আমার যুগের লোকেরা হল সর্বশ্রেষ্ঠ, এরপর তাদের পরের যুগের লোকেরা’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় দান কর, তবুও তাঁদের (সাহাবীদের) এক–দুই মুঠো বা তার অর্ধেক দানের সওয়াবের সমকক্ষ হতে পারবে না’। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর যে চারজন সাহাবী সর্বোচ্চ মর্যাদায় রয়েছেন তাঁরা হলেন, ইসলামের চার খলিফা। ১। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ২। হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ৩। হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রাঃ) ৪। হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)। পাশাপাশি যে ১০ জন সাহাবী তাঁদের জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সু–সংবাদ পেয়েছিলেন তাঁদেরকে বলা হয় ‘আশারায়ে মুবাশ্শারা’। তাঁদের মধ্যে উক্ত চার খলিফা ছাড়াও অন্য ৬ জন হচ্ছেন– ১। হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) ২। হযরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রাঃ) ৩। হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) ৪। হযরত আবু ওবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) ৫। হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) ৬। হযরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ)। যারাই কোরআন সুন্নাহকে সাহাবায়ে কেরামগণের (রাঃ) আদর্শ অনুযায়ী অনুসরণ করে তারাই মূলত মুক্তি প্রাপ্ত, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত দল, এর বাইরে যত দল, মত বা মতবাদ রয়েছে সবগুলো ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী। আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে পাকে বলেন, ‘মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল, তুঁমি তাদের দেখবে, তাঁরা রুকু ও সেজদাবনত অবস্থায় রয়েছে, তাঁরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করছে, তাঁদের চেহারায় সেজদার চিহ্ন রয়েছে’– সূরা– আল ফাতাহ– ২৯। আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছে জান্নাত, যার নিম্ন দেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসফলতা’– সূরা–তাওবা–১০। সাহাবীগণের মর্যাদা সম্পর্কে যে গুরুত্ব হাদীসসমূহ রয়েছে তাদের মধ্যে একটি হল: হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত– রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘জাহান্নামের আগুন সেই মুসলমানকে স্পর্শ করতে পারে না, যে আমাকে দেখেছে অর্থাৎ আমার সাহাবীগণ কিংবা আমাকে যারা দেখেছে এবং সাহাবীদের যারা দেখেছে অর্থাৎ তাবেঈগণ’ (তিরমিজি–৩৮০১)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মোগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে আমার সাহাবীদের কষ্ট দিল, সে যেন আমাকে কষ্ট দিল; যে আমাকে কষ্ট দিল, সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিল; অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন’ (মুসনাদে আহমেদ–১৯৬৪১)। হযরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি বিদায় হজ্বের দিন আরাফাতের ময়দানে রাসূল (সাঃ)কে কাসওয়া উষ্ট্রির উপর আরোহণ অবস্থায় উপদেশ দিতে দেখেছি, ‘হে মানুষেরা! আমি তোমাদের মধ্যে এমন দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি, যার অনুসরণ ও অনুকরণ করলে তোমরা অবশ্যই পথহারা হবে না। তা হল: আল্লাহ পাকের কিতাব ও আহলে বাইয়্যাত’ (তিরমিজি)। দ্বিতীয় হিজরীতে বদর যুদ্ধে ৩১৩ জন সাহাবীদের একটি দল অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন’। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যে মহামান্য সাহাবীগণ গাছের নিচে রাসূল (সাঃ) এর হাতে বায়াত বা শপথ করেছিলেন তাঁদের ব্যাপারে কুরআনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁদেরকে বলা হয় সাহাবায়ে শাজারা। যারা প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হল: হযরত খাদিজা (রাঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত বেলাল (রাঃ)। মক্কা বিজয়ের আগে এবং পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন উভয় পক্ষেরই আলাদা মর্যাদা রয়েছে।
সাহাবীদের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর কোরআন বলছে,‘ তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর উপর ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে। তারাই (সাহাবীগণ) হলেন সত্যনিষ্ঠ বা সত্যবাদী’– সূরা– হুজুরাত–১৫। আল্লাহতায়ালা সাহাবায়ে কেরামগণের ঈমানকে সত্যের মাপকাঠি হিসেবে অবহিত করেছেন, ‘যদি তারা ঈমান আনে, যেভাবে তোমরা ঈমান এনেছো, তবে তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা হটকারিতার মধ্যে রয়েছে’– সূরা বাকারা– ১৩৭। হযরত ইমরান বিন হোসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম তারা যারা আমার যুগে রয়েছে, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের উম্মত (অর্থাৎ তাবেঈ– তাবে–তাবেঈগনের যুগ), (সহীহ বুখারী ৪/২৮৭–২৮৮,সহীহ মুসলিম ৪/১৯৬৪)। সূরা হুজুরাতের ৮ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন,‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, শিরক, পাপাচার ও নাফরমানের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাঁরাই (সাহাবীগণ) সৎপথ অবলম্বনকারী’। সাহাবীদের মর্যাদা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ‘সাবধান! তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, আমার পরে তোমরা তাদেরকে (তিরষ্কারের) লক্ষ্যবস্তু বানাইও না’ (তিরমিযি–৩৮৬১)। অতএব সাহাবীগণের প্রতি ভালবাসা পোষণ করা, তাঁদের পথ অবলম্বন করা, তাঁদের আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়া প্রত্যেক মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট হওয়া উচিৎ। আমাদের অন্তর, প্রেম দিয়ে রাসূলে করীম (সাঃ) এর সাহাবীগণদের ভালবাসবো। মহান রাব্বুল আ’লামিন সম্মানিত সাহাবীগণদের বরকত দান করুন। আমিন।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, অধ্যাপক (চ.দা.) (ইএনটি)-অবঃ রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ












