চট্টগ্রামে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি অর্ধেকের বয়স ২ বছরের নিচে

নগর ও চট্টগ্রাম জেলার হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, ভর্তির রোগীদের বেশির ভাগ বাইরের জেলার : সিভিল সার্জন

জাহেদুল কবির | শুক্রবার , ১৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে হাসপাতালগুলোতে এখনো হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে রোগী। এখন পর্যন্ত মোট হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে সরকারিবেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৮৫ জন। এরমধ্যে অর্ধেকের বয়স ২ বছরের নিচে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যে হামের টিকা দেয়নি, এক ডোজ দিয়েছে, আবার একদমই দেয়নি এরকম শিশুও রয়েছে। তবে উপসর্গ নিয়ে আসা অনেক শিশুর টিকা দেয়ার বয়সই হয়নি। আগে এক সময় ৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হতো। হামের প্রকোপ বাড়ার কারণে সেটি ৩ মাস এগিয়ে আনে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই হিসেবে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামরুবেলার টিকা দেয়া হয়। মাসব্যাপী চলা সেই ক্যাম্পেইনে চট্টগ্রাম উপজেলা ও নগরীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে হামরুবেলার টিকা দেয়া হয়েছে। তারপরেও এখনো চট্টগ্রামের সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ গড়ে ৫০ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে।

তবে এদের মধ্যে অনেক শিশু পরীক্ষার বাইরে থাকায় হামের সঠিক চিত্র উঠে আসছে না। বিশেষ করে অনেক শিশু উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হলেও পরীক্ষার বাইরে থাকায় পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের হাম হয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের অন্যতম প্রধান উপসর্গ র‌্যাশের সাথে নিউমোনিয়া। এখন কোন শিশুর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়েছে, আর কার হামের কারণে নিউমোনিয়া হয়েছে, সেটি পরীক্ষা না করে বলা যায় না। তাই শিশুদের মৃত্যু সনদে জ্বর পরবর্তী র‌্যাশ ও নিউমোনিয়ায় মারা গেছে বলে উল্লেখ করতে হচ্ছে।

চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে আসা মোট রোগীর ৫০ শতাংশ কঙবাজার অঞ্চলের। এছাড়া ফেনী থেকে রোগী আসছে। এদিকে চমেক হাসপাতাল ছাড়াও হামের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বিআইটিআইডি হাসপাতাল, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ এবং বেসরকারি মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে গতকাল উপসর্গ নিয়ে আরো ৩৮ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭৪ জন ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৪ হাজার ৩৯৯ জন নগরীর এবং ১৭৫ জন উপজেলার। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজর ৩১০ জন। এখন পর্যন্ত মোট হাম আক্রান্ত হয়েছে ৩৬১ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১২ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়ে মারা গেছে ৩ শিশু। গতকাল পর্যন্ত ঢাকায় পরীক্ষার জন্য মোট নমুনা পাঠানো হয়েছে ১ হাজার ৮৯২ জনের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশিহাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময় মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। তবে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খায় এবং ভিটামিন ‘এ‘ ঘাটতি নেই তাদের হাম হওয়ার সম্ভাবনা কম। হাম প্রতিরোধের জন্য শিশুদের অপুষ্টি রোধ করা জরুরি। হাম এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। যাদের ভিটামিনের ঘাটতি হয় এবং অপুষ্টিতে ভোগে তাদের হাম হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। নিয়মিত চিকিৎসায় বেশিরভাগ শিশু ভালো হয়ে যায়। হাম ছোঁয়াছে হওয়ার কারণে রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবার চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হামের টিকা দেয়া হয়েছে। বাদ পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুুঁজে খুঁজে টিকা দেয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে এখনো অনেক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে এসব শিশুর বেশিরভাগই আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে। আমাদের চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীতে হাম উপসর্গের রোগী কমে গেছে।

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, আমাদের হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ শিশু টিকা নেয়নি। আবার কিছু শিশুর টিকা নেয়ার বয়স হয়নি, আবার কিছু শিশু এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। আবার দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এমন শিশুও আছে। হামের রোগীদের আমরা আলাদা করে চিকিৎসা দিচ্ছি।

সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবিস্থত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, হামের উপসর্গের দিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে যদি কোনো শিশুর জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং র‌্যাশ আসে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই রোগে নিউমোনিয়াও হতে পারে। বাসায় নিয়ে বসে থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে ৮ জনের মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধজলকদর খালের ৮৯ স্লুইচগেটের অধিকাংশ জরাজীর্ণ ও অচল