জলকদর খালের ৮৯ স্লুইচগেটের অধিকাংশ জরাজীর্ণ ও অচল

বাঁশখালীতে জলাবদ্ধ মানুষের চরম ভোগান্তি

কল্যাণ বড়ুয়া, বাঁশখালী | শুক্রবার , ১৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:২০ পূর্বাহ্ণ

বাঁশখালীতে সম্প্রতি বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বাড়িঘর নানাভাবে বিধস্ত হয়েছে। ফসলি জমি, মাছের ঘের, লবণের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেকে বাড়ি ঘর হারিয়ে এখন পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। কাঁচা মাটির বাড়িঘর অধিকাংশ ভেঙে পড়লেও যে সব বাড়িঘর দাঁড়িয়ে আছে সে সব ভেঙে পড়ার আশংকায় আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা আত্মীয় স্বজনের পাকা বাড়িতে অবস্থান করে দিন যাপন করছে। গতকাল বৃস্পতিবার দুপুরে সরলের জলদী ভাদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জালিয়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা যায় প্রায় অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ। তাদের মধ্যে ফাতেমা বেগম, হোছনে আরা, শাহ আলম ও নুর উদ্দিন জানান, তাদের বাড়িঘর ভেঙে পড়াতে এখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছে। দিনের বেলা বয়স্ক ও মহিলারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে আর পুরুষ সদস্যরা ভেঙে পড়া বাড়িতে গিয়ে নানা ধরনের বাড়ির সংস্কার কাজ করছে বলে জানান তারা।

সম্প্রতি বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ ক্ষতির কবলে পড়লে উঠে আসে ঐতিহ্যবাহী জলকদর খালে নির্মিত ৮৯টি স্লুইচগেইট এর কথা। যে স্লুইচগেইট গুলো বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টি সম্পূর্ণ অচল এবং ১৮টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। অবশিষ্ট স্লুইচগেটও কোনোরকমে সচল থাকলেও কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে।

স্থানীয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ ও ১৯৮০এর দশকে ৪০ থেকে ৫৬ বছর আগে নির্মিত এসব স্লুইচগেটের অধিকাংশই বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাঁশখালীর মানুষের ফসলি জমি ও বসতভিটা জোয়ারের নোনা পানির আগ্রাসন থেকে রক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের নোনা পানি ঠেকানো এবং ভাটার সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে নিষ্কাশনের জন্য ৮৯টি স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইচগেট বন্ধ করে দেওয়াকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্লুইচগেটগুলো এখনও কার্যকর রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বছরের পর বছর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন অনেক স্লুইচগেটই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দ্রুত অচল স্লুইচগেটগুলো প্রতিস্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত গেটগুলো সচল আধুনিকায়ন না করা হলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাঁশখালী প্রায় ২০/৩০টি ছোটবড় পাহাড়ি ছড়া ও খাল রয়েছে। সেগুলো দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। এতে স্লুইচগেট কানেক্টিং খালগুলো দীর্ঘদিন খননের অভাবে পানি নিষ্কাশনের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যেন জোয়ারের সময় লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেভাবে ডিজাইন করে স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, জোয়ারের সময় এই গেটগুলো বন্ধ রাখা হয় যেন সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। আর ভাটার সময় গেটগুলো খুলে যায়, যেন উজানের বন্যার পানি ও বৃষ্টির পানি নদী হয়ে সাগরে চলে যেতে পারে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বাঁশখালীর স্লুইচগেটগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সংখ্যাও বাড়াতে হবে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো বন্ধ করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে ৩৩টি স্লুইচগেট প্রতিস্থাপন, জলকদর খাল ও ছোট ছনুয়া খালের পুনঃখনন এবং কয়েকটি স্থানে বাঁধ পুনর্বিন্যাস (রিসেকশনিং) কাজ অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামীতে ডিপিপিটি জমা দেওয়া হবে।

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি মাছের ঘেরের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্লুইচগেটগুলো বন্ধ করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে এসব স্লুইচগেট কার্যত মাছের ঘেরে পরিণত করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ২০টি স্থানে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি। তিনি আরও বলেন, স্লুইচ গেটগুলো দিয়ে যদি যথাযথভাবে পানি নিষ্কাশন করা যেত, তাহলে বন্যা পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতো না। তিনি আরও জানান, ঘের বাঁচাতে স্থানীয়রা অবৈধভাবে কিছু বাঁধ তৈরি করেছেন। এ কারণে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকছে এবং এতে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ বাসিন্দা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

এদিকে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মো. আসাদুল হাবিব দুদু গত বুধবার বাঁশখালীর খালখনন পরির্দশনকালে জলকদর খালকে সরকারের সারাদেশের ৫০টি খালের মধ্যে একটি মডেল খাল হিসাবে সংস্কার করা হবে বলে জানান। স্থানীয় জনগণের মতে এ খালটি সংস্কার ও স্লুইচগেইট গুলো সংস্কার করে পানি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানি অনেকাংশ কমানো সম্ভব হবে বলে জানান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি অর্ধেকের বয়স ২ বছরের নিচে
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে নিখোঁজের একদিন পর ডোবায় মিলল শিশুর লাশ