মাদক আজ দেশের অন্যতম জটিল সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মাদকের বিস্তার একজন ব্যক্তির জীবনকেই শুধু ধ্বংস করে না। একটি পরিবারকে বিপর্যস্ত করে। সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে এবং জাতীয় উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ নানা প্রলোভন, হতাশা কিংবা কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে মাদকের বিস্তার উল্লেখজনক হারে বেড়েছে। নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলার পরও থামানো যাচ্ছে না মাদকের বিস্তার। শহর থেকে গ্রামে সবখানেই ইয়াবা, হেরোইন ও ফেনসিডিল সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এই মরণ নেশায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে কিশোর ও তরুণরা। ফলে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক অস্থিরতা। মূলত সীমান্তঘেঁষা অবস্থান, পাচারের সহজ রুট আর দুর্বল সামাজিক প্রতিরোধের সুযোগ নিয়ে গোটা সীমান্তবর্তী জেলা মাদকের ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার বন্ধ না হওয়ার নেপথ্যে অন্তত ছয়টি বিশেষ কারণের কথা উল্লেখ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, মাদকের প্রবল চাহিদা ও সহজলভ্যতা, ভৌগলিক ট্রানজিট, গডফাদাররা অধরা থাকা, সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের বিস্তার ও অপকৌশল, আইনি ফাঁকফোকর এবং পুনর্বাসনের অভাব থেকেই সমাজে মাদকের ব্যাপক বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। মাদক মামলার আসামিরা সহজইে আইনি সুযোগ নিয়ে জামিন পেয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদকের স্পটে কেনাবেচা ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ বা গ্রুপ খুলে মাদক বেচাকেনা চলছে। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে টেকনাফ সীমান্তজুড়ে প্রবাহিত নাফ নদী দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম মাদক প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত। এই সীমান্ত দিয়ে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত বাহক ও খুচরা কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও অভিযোগ রয়েছে, পাচার চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক ও প্রভাশালী পৃষ্ঠপোষকদের বড় একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও থামছে না পাচার; বরং নতুন নতুন রুট ও কৌশলে বিস্তৃত হচ্ছে অবৈধ এই নেটওয়ার্ক।
কক্সবাজার টেকনাফ সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায়ই লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছেন শত শত ব্যক্তি। তবুও থামছে না পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, দেশের দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্তজুড়ে অর্ধশতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে নিয়মিত বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে। নাফ নদী, পাহাড়ী পথ, ছড়া, উপকূলীয় এলাকা, মাছ ধরার ট্রলার এবং দুর্গম সীমান্ত করিডরকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটগুলো মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে কক্সবাজার জেলায় মোট ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ পিস ইয়াবা, ৫ দশমিক ২৫০ কেজি আইস, ৪০ দশমিক ৩ কেজি গাঁজা এবং ৬৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯৮ জনকে আটক করা হয়। জব্দ মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪২ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ টাকা।
বিশেষজ্ঞ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সীমান্ত এলাকায় মাদক বিস্তারের পেছনে কয়েকটি কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, মিয়ানমারভিত্তিক চক্রগুলো বর্তমানে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ইয়াবা ও আইস সরবরাহ করায় সহজেই নতুন কারবারি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক বিক্রির বিপুল অর্থ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল ও হুন্ডির মাধ্যমে সীমান্তের ওপারে চলে গেলেও সেই আর্থিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মাদকের মহামারি এই দুইয়ে মিলে আজ আমাদের সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। যতক্ষণ না আমরা মাদকের সরবরাহ ও এর কুপ্রভাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাব এবং যতক্ষণ না প্রতিটি অপরাধের বিচার স্বচ্ছ ও দ্রুত নিশ্চিত করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজে নৃশংসতা চলতেই থাকবে।
এছাড়া মাদক মামলাগুলোর তদন্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহক বা ক্ষুদ্র পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও মাদকের উৎস, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন কিছু এলাকা মাদক পাচার ও সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে সীমান্তের এক প্রান্তে অভিযান চললেও অন্য প্রান্তে নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠছে পাচারকারীরা, যা মাদকবিরোধী লড়াইকে আরও জটিল করে তুলছে।
আমাদের বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে মাদকের ভূমিকা গোপন কিছু নয়। ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী খুনের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অপরাধীর রক্তে নেশায় আধিক্য। নেশাগ্রস্ত মস্তিস্ক মানুষের মধ্যে পৈশাবিক প্রবৃত্তিকে উচকে দেয়। আর এই পৈশাচিকতা যখন সমাজে রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ তার নিজের ঘরকেও নিরাপদ মনে করতে পারে না।
মাদক নির্মূলে সরকারকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সীমান্তের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। মাদকের ভয়াবহতা রুখতে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে এগোতে হবে সরকারকে। পরিবারের অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় সবাইকে এ ব্যাপারে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদক প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুর্বার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম, মসজিদ ও মন্দির সকলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাদকের কুফল সম্পর্কে নিয়মিত প্রচার, সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ এবং মাদকাসক্তের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একজন মাদকাসক্তকে সমাজে পুনবার্সিত করতে পরিবার ও সমাজের সহানুভূতিশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যখন সমাজ মাদকের গ্রাসে পড়ে, তখন মানবিক বোধ লোপ পায় এবং পেশিশক্তির দাপটে আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই রক্তক্ষরণ থামাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের অস্তিত্ব এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তার খাতিরেই এই অন্ধকার ভাঙতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক। সম্পাদক : শিল্পশৈলী।












