চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ হাজার ৮৬০ ঘর, ৩৭৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পানি নামছে, বন্যাকবলিত এলাকায় দুর্ভোগ কমেনি

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে বন্যার পানি নামলেও বানভাসিদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা কমেনি। পানি কমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা ঘরবাড়ি পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন করা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা শুরু করেছেন। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পানি নেমে যাওয়ার পর কাদাভরা ঘর এবং বাড়িজুড়ে ময়লাআবর্জনা নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি সচল না থাকায় দুর্দশায় পড়া মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিডিনিউজের খবরে বলা হয়, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৬০টি বসতঘর এবং ৩৭৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৪৫টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ধস, দেয়াল চাপা পড়ে এবং পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ৪ হাজার ৫১৯টি বসতঘর এবং প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। উপজেলাটিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮০টি বসতঘর, ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৮৭ কিলোমিটার সড়ক এবং ৯টি সেতু ও কালভার্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার এ দুর্যোগে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় তিনজন করে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের হিসাবে, চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। এতে ২ হাজার ২৪৬টি বসতঘর, ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ১২৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরে দুইজন এবং সীতাকুণ্ড, হাটহাজারি ও রাঙ্গুনিয়ায় একজন করে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

বান্দরবানে সড়ক যোগাযোগ চালু : আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানে বৃষ্টির পরিমাণ কমায় প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে নেমেছে বন্যার পানি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে আপনগৃহে ফিরতে শুরু করেছে বানভাসিরা। সড়কের পানি নেমে যাওয়ায় বান্দরবান জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগও চালু হয়েছে। গতকাল থেকে বান্দরবানকেরানীহাট প্রধান সড়কপথে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। লামাআলীকদম উপজেলা অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগও চালু হয়েছে।

তবে রাঙামাটিবাঙালহালিয়া সড়ক যোগাযোগ এখনো বন্ধ রয়েছে। জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি এবং থানচিআলীকদম, লামাসূয়ালক সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোটবড় পাহাড় ধসে সড়কের ওপরে মাটি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ত্রাণ তৎপরতা চলমান রয়েছে। পর্যাপ্ত চাল মওজুদ রয়েছে ত্রাণ শাখায়। উপজেলা পর্যায়ে বন্টন করে ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য স্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বাঁশখালীর অভ্যন্তরীণ সড়কের নাজুক অবস্থা : বাঁশখালী প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বাঁশখালী উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। একদিকে প্রধান সড়কের কয়েকটি স্থানে ভাঙ্গন ও ফাটলের কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্দশায় পড়া মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভেসে উঠছে বন্যায় লণ্ডভণ্ড সড়ক : চকরিয়া প্রতিনিধি জানান, রবিবার দুপুরের পর থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ হওয়ায় অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা থেকে নেমে যেতে শুরু করে বানের পানি। সেইসাথে ভেসে উঠে ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হওয়া সড়ক, বিধ্বস্ত ঘরবাড়িসহ গ্রামীণ অবকাঠামো। শুধুমাত্র স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চকরিয়া কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ীএবারের ভয়াবহ বন্যায় চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীণ প্রায় ১১০টি সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং ৩০ মিটার দৈর্ঘ্য একটি কালভার্ট ব্যাপকভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একইসাথে কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, গ্রামীণ অবকাঠামো, পাউবোর বেড়িবাঁধসহ অন্যান্য যোগাযোগ খাতে কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে দুই উপজেলার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা থেকে এখনো পানি সরে না যাওয়ায় এসব খাতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো নিরূপণ করতে পারেনি স্ব স্ব দপ্তর বা উপজেলা প্রশাসন।

উল্লেখ্যএবারের ভয়াবহ বন্যায় শুধুমাত্র চকরিয়া উপজেলায় পাহাড় ধ্বস, পানিতে ডুবে, ভেসে গিয়ে এবং বিদ্যুতায়িত হওয়াসহ সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সাতজন মারা গেছে। তন্মধ্যে পাঁচজন শিশু রয়েছে।

এ ব্যাপারে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, বানের পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর আসল ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নিরূপণ সম্ভব হবে কোন কোন খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর পরই পুনরায় সড়ক যোগাযোগসহ গ্রামীণ অবকাঠামো পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফেরাতে কাজ শুরু করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরের ১৯৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতবিক্ষত
পরবর্তী নিবন্ধচাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুট